মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

গণতান্ত্রিক রূপান্তর ও এলডিসি উত্তরণে বাংলাদেশের পাশে ফ্রান্স : রাষ্ট্রদূত

প্রথম পাতা » ছবি গ্যালারী » গণতান্ত্রিক রূপান্তর ও এলডিসি উত্তরণে বাংলাদেশের পাশে ফ্রান্স : রাষ্ট্রদূত
মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬



গণতান্ত্রিক রূপান্তর ও এলডিসি উত্তরণে বাংলাদেশের পাশে ফ্রান্স : রাষ্ট্রদূত

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর ও স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে ফ্রান্স। একই সঙ্গে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদার করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে দেশটি।

ঢাকায় নিযুক্ত ফরাসি রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-শার্লে আজ কূটনৈতিক সাংবাদিকদের সংগঠন ‘ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ’ (ডিক্যাব) আয়োজিত ‘ডিক্যাব টক’-এ এসব কথা বলেন।

রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘বাংলাদেশে বর্তমানে যে বড় ধরনের পরিবর্তন ও রাজনৈতিক সংস্কার হচ্ছে, ফরাসি কূটনীতি তাতে সক্রিয়ভাবে সমর্থন দিচ্ছে। পাশাপাশি এলডিসি থেকে বাংলাদেশের আসন্ন উত্তরণেও ফ্রান্স পাশে রয়েছে।’

বাংলাদেশ-ফ্রান্স সম্পর্ককে ‘দীর্ঘদিনের, নির্ভরযোগ্য, পূর্বানুমানযোগ্য ও বন্ধুত্বপূর্ণ’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, সংঘাত নয়- বরং সহযোগিতা, বহুপক্ষীয়তাবাদ ও বিশ্বশান্তির নীতিতে বিশ্বাস করে দুই দেশ। দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে ঢাকার সঙ্গে প্যারিসের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধির পাশাপাশি এ সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নেওয়ার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে।

তিনি বলেন, অভিন্ন মূল্যবোধ ও লক্ষ্যসম্পন্ন দেশগুলোর আরও ঘনিষ্ঠ ও সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করা উচিত।

দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের তথ্য তুলে ধরে রাষ্ট্রদূত জানান, দুই দেশের বাণিজ্য এখন ৪৫০ কোটি ইউরো ছাড়িয়েছে। যা গত এক দশকে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধির প্রতিফলন। তবে এই বাণিজ্য কাঠামো মূলত বাংলাদেশের অনুকূলে। কারণ ফ্রান্সের মোট আমদানির প্রায় ৯৫ শতাংশই বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাত থেকে আসে। বিপরীতে ফ্রান্সের রফতানি বেশ কম।

তিনি জানান, বর্তমানে ফ্রাঙ্কো-বাংলাদেশি অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা মূলত পরিবহন, জ্বালানি ও জলবায়ু-সহনশীল নগর উন্নয়নের মতো বড় বড় শিল্পে সীমাবদ্ধ। তবে ভবিষ্যতে ওষুধ শিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ডিজিটাল প্রযুক্তি খাতে বাণিজ্য বহুমুখীকরণের সুযোগ রয়েছে।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জন্য উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে সেরে-শার্লে বলেন, ইউরোপীয় অংশীদারদের সঙ্গে বেসামরিক বিমান চলাচল খাতে বাংলাদেশ একটি দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক তৈরি করবে বলে আমরা আশাবাদী। এয়ারবাস ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মধ্যে আলোচনা চলছে এবং তা খুব ইতিবাচকভাবেই এগোচ্ছে।

কৌশলগত প্রসঙ্গে রাষ্ট্রদূত উল্লেখ করেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের একমাত্র সদস্য দেশ হিসেবে ফ্রান্স নিজেই একটি বড় ইন্দো-প্যাসিফিক শক্তি, যেখানে প্রায় ২০ লাখ ফরাসি নাগরিক বাস করেন। ফ্রান্স কোনো সংঘাত চায় না, বরং বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে উত্তর ভারত মহাসাগরে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক আইন বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো যেন কোনো বৃহৎ শক্তির লড়াইয়ে কোনো একপক্ষ বেছে নিতে বাধ্য না হয়ে নিজেদের স্বাধীন স্বার্থ রক্ষা করতে পারে, প্যারিস সেটিই চায়। এছাড়া সমুদ্রপথে জলদস্যুতা, অবৈধ মাছ শিকার ও মানবপাচার রোধেও ফ্রান্স ঢাকার সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করতে আগ্রহী।

রাষ্ট্রদূত বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশ-ফ্রান্স সহযোগিতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। আন্তর্জাতিক জলবায়ু কূটনীতিতে ফ্রান্সের ভূমিকা এবং ২০১৫ সালে প্যারিস চুক্তি গ্রহণের বিষয়টিও তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি জানান, ফরাসি উন্নয়ন সংস্থায় (এএফডি) দেওয়া তহবিলের ৮০ শতাংশেরও বেশি অর্থ জলবায়ু সহনশীলতা ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে ব্যবহৃত হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ঝুঁকিপূর্ণ বাংলাদেশকে জলবায়ু অভিযোজন, টেকসই ও পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণ এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় ফ্রান্স আরও জোরালো সহায়তা দেবে।

এ কারণে দুই দেশ টেকসই অবকাঠামো এবং পরিবেশবান্ধব অভিযোজনমূলক উদ্যোগ নিয়ে তাদের সংলাপ আরও জোরদার করছে বলেও তিনি জানান।

তিনি ফ্রান্সের ‘নারীবাদী পররাষ্ট্রনীতি’ (২০২৫-২০৩০)-র কথা তুলে ধরে বলেন, নারীর অধিকার, লিঙ্গসমতা, শিক্ষা, লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা রোধ, নারীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, নারীবাদী জলবায়ু কার্যক্রম এবং প্রযুক্তি ক্ষেত্রে নারীদের সম্পৃক্ততায় তাদের বিশেষ লক্ষ্য রয়েছে।

বৃহত্তর আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয়টি তুলে ধরে সেরে-শার্লে বলেন, বিশ্ব বর্তমানে ব্যাপক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ সময়ে ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত, সংঘর্ষ ও অনিশ্চয়তা ক্রমেই বাড়ছে।

এমন পরিস্থিতিতে ফ্রান্স ও বাংলাদেশের সংলাপ, সহযোগিতা, বহুপক্ষীয়তাবাদ এবং শান্তিপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সমুন্নত রাখার অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে বলেও জানান তিনি।

জটিলতা সত্ত্বেও সংলাপ ও সহযোগিতার মাধ্যমে শান্তি ও সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠায় ইউরোপীয় একীভূতকরণকে একটি উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে রাষ্ট্রদূত জানান, ২০২৫ সালের ২২ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশনে ফরাসি সরকার ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়। ফিলিস্তিনিদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা এবং মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে ইসরাইলের নিরাপত্তার প্রতিও ফ্রান্সের অঙ্গীকার রয়েছে।

বাংলাদেশ-ফ্রান্স সম্পর্কের প্রসঙ্গে আবারও সেরে-শার্লে বলেন, রাজনৈতিক উত্তরণ, এলডিসি থেকে উত্তরণ, জলবায়ু সহনশীলতা, অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণ এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ঢাকা ও প্যারিসের মধ্যে আরও গভীর সহযোগিতার বড় সুযোগ তৈরি করেছে।

তিনি বলেন, সর্বশেষ ফ্রান্সের এই সমর্থনের ঘোষণা এমন এক সময়ে এলো যখন দুই দেশ দীর্ঘদিনের উন্নয়ন সহযোগিতার গণ্ডি পেরিয়ে তাদের অংশীদারিত্ব আরও বিস্তৃত করার চেষ্টা করছে।

উল্লেখ্য, গত ১৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা, বিমান চলাচল, শিক্ষা ও সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন খাতে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়। উক্ত বৈঠকে বাংলাদেশ অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জলবায়ু পরিবর্তন, মহাকাশ প্রযুক্তি ও ওষুধ খাতে ফ্রান্সের অতিরিক্ত বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক উত্তরণের সময়ে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, উন্নয়ন ও কৌশলগত—সব ক্ষেত্রেই ঢাকার সঙ্গে সম্পৃক্ততা আরও গভীর করতে প্যারিস প্রস্তুত রয়েছে বলে জানান তিনি।

অনুষ্ঠানে ডিক্যাব সভাপতি এ কে এম মঈনউদ্দীন ও সাধারণ সম্পাদক ইমরুল কায়েস বক্তব্য দেন।

বাংলাদেশ সময়: ১৭:৫০:৩৯   ১৮ বার পঠিত