![]()
সদরপুর (ফরিদপুর) প্রতিনিধি : ফরিদপুরের নগরকান্দা পৌরসভার চৌমুখা পশ্চিমপাড়া সর্বজনীন দুর্গা মন্দিরসংলগ্ন ৩৭ শতাংশ জমি নিয়ে বিরোধ আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। মন্দিরের জমি দখলের অভিযোগে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের একাংশের মানববন্ধন ও বিক্ষোভ, এর পাল্টায় প্রয়াত সেবায়েত নারায়ণ চন্দ্র মণ্ডলের পরিবারের সংবাদ সম্মেলনের পর বিরোধপূর্ণ জমি নিয়ে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারায় আদালতে আবেদন করা হয়।
আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে এ বিরোধ যাতে সংঘাত বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণ না হয়, সে জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ দুই পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করছে। শান্তিপূর্ণভাবে পূজা সম্পন্ন করতে উভয় পক্ষকে মুচলেকা দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
গত ১০ সেপ্টেম্বর চৌমুখা পশ্চিমপাড়া সর্বজনীন দুর্গা মন্দিরের সামনে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেন স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের কয়েক শতাধিক নারী-পুরুষ।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের অভিযোগ, প্রায় ৪০ বছরের পুরোনো এই মন্দিরের জমির একটি অংশ প্রয়াত সেবায়েত ও সাবেক সভাপতি নারায়ণ চন্দ্র মণ্ডলের পরিবারের সদস্যরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
তাঁদের আরও অভিযোগ, মন্দিরসংলগ্ন জায়গায় গরুর খামার, খড়ের মাচাসহ বিভিন্ন স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে। এমনকি মন্দিরের জমি বিক্রিরও চেষ্টা করা হচ্ছে। তাঁরা জমিটি মন্দিরের ব্যবহারের জন্য নিশ্চিত করা এবং নির্বিঘ্নে পূজা-অর্চনার পরিবেশ বজায় রাখতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ দাবি করেন।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে পরদিন নিজেদের বাড়িতে সংবাদ সম্মেলন করেন প্রয়াত নারায়ণ চন্দ্র মণ্ডলের পরিবারের সদস্যরা।
সংবাদ সম্মেলনে নারায়ণ চন্দ্র মণ্ডলের ছেলে বৃন্দাবন মণ্ডল দাবি করেন, ২০০০ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁর বাবার নামে ৯৯ বছরের জন্য ওই জমির কবুলিয়াত দেয়।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ১৫৭ নম্বর চৌমুখা মৌজার ৬৯৮ ও ৭০২ নম্বর দাগে মোট ৩৭ শতাংশ জমি তাঁদের পরিবার দীর্ঘদিন ধরে বৈধভাবে ভোগদখল করে আসছে। জমিটির একটি অংশে মন্দির রয়েছে এবং অবশিষ্ট অংশ তাঁদের পরিবার ব্যবহার করছে।
বৃন্দাবন মণ্ডল বলেন, “সরকার আমাদের ৯৯ বছরের জন্য জায়গাটি কবুলিয়াত দিয়েছে। সরকারের জমি নিয়ে প্রশাসন যে সিদ্ধান্ত নেবে, আমরা তা মেনে নেব। তবে কোনো অসাধু ব্যক্তিকে এই জমি দখল করতে দেব না।”
তাঁদের বিরুদ্ধে মন্দিরের জমি দখলের যে অভিযোগ করা হয়েছে, সেটিকে মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেও দাবি করেন তিনি।
আদালতে ১৪৪ ধারায় আবেদন
পরে বিরোধপূর্ণ জমি নিয়ে গ্রামবাসীর পক্ষে শ্রীদাম বিশ্বাস ফরিদপুরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারায় আবেদন করেন। আবেদনে বৃন্দাবন মণ্ডল, লিটন মণ্ডল ও সুমন মণ্ডলকে প্রতিপক্ষ করা হয়।
আদালতে দাখিল করা নথিতে ঘটনার তারিখ ও সময় হিসেবে ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রোববার সকাল আনুমানিক ১০টা উল্লেখ করা হয়েছে।
নথিতে বিরোধপূর্ণ সম্পত্তির বিবরণে ১৫৭ নম্বর চৌমুখা মৌজার এসএ খতিয়ান নম্বর ১৭১-এর ৬৯৮ নম্বর দাগে ৩২ শতাংশ এবং এসএ খতিয়ান নম্বর ৩৪৫-এর ৭০২ নম্বর দাগে ৫ শতাংশ, মোট ৩৭ শতাংশ জমির কথা বলা হয়েছে।
আবেদনে অভিযোগ করা হয়, প্রতিপক্ষ ওই জমিতে প্রবেশ করে মন্দির সরানো ও বাড়িঘর নির্মাণের চেষ্টা করছেন। এতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে, এমন আশঙ্কা জানিয়ে আদালতের হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়। একই সঙ্গে বিষয়টি তদন্ত এবং বিরোধপূর্ণ জায়গায় শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন করা হয়।
নথির ওপর দেওয়া নির্দেশনায় ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখ রয়েছে। সেখানে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, ফরিদপুরের পদবির সিল ও স্বাক্ষর দেখা যায়। তবে পাওয়া নথির ছবিতে স্বাক্ষরকারী কর্মকর্তার ব্যক্তিনাম স্পষ্টভাবে পড়া যায়নি।
আদালতের নথিতে বিরোধপূর্ণ জমির মোট পরিমাণ ৩৭ শতাংশ উল্লেখ করা হয়েছে। মণ্ডল পরিবারও সংবাদ সম্মেলনে ৩৭ শতাংশ জমির কবুলিয়াত থাকার দাবি করেছে। তবে জমির কোন অংশ কত দিন ধরে মন্দিরের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে, কবুলিয়াতের শর্ত কী এবং ওই জমিতে কার কী ধরনের ব্যবহারিক অধিকার রয়েছে, মূল বিরোধ এসব বিষয় নিয়েই।
আদালতের নির্দেশনার পর ঘটনাস্থলে পুলিশ
আদালতের নির্দেশনা পাওয়ার পর নগরকান্দা থানার পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এবং দুই পক্ষের সঙ্গে কথা বলে।
নগরকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাসূল সামদানি আজাদ বলেন, আদালত থেকে তাঁদের কাছে একটি আদেশ আসার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে যায় এবং উভয় পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে।
তিনি বলেন, সামনে দুর্গাপূজা হওয়ায় দুই পক্ষই মন্দিরে পূজা করতে চাইছে। অন্যদিকে আদালতের নির্দেশনা থাকায় জনসমাগম ও আইনশৃঙ্খলার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে।
ওসি বলেন, “গ্রামবাসীর অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে দুই পক্ষকেই মুচলেকা দিতে বলা হয়েছে, যাতে পূজা চলাকালে কোনো ধরনের ঝামেলা বা অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে। তারা শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার অঙ্গীকার করলে শান্তিপূর্ণভাবে পূজা সম্পন্ন করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা আফরিন বলেন, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো নোটিশ এখনো উপজেলা প্রশাসনের কাছে পৌঁছায়নি। তবে তাঁরা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত।
তিনি বলেন, “১৪৪ ধারাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে যাতে কোনো ধরনের ঝামেলা সৃষ্টি না হয়, সে জন্য আমরা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করছি। দুর্গাপূজা কীভাবে নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করা যায়, সে বিষয়েও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) খায়রুল হাসান বলেন, তিনি থানার ওসিসহ স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।
তিনি জানান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঠেকানো এবং শান্তিপূর্ণভাবে দুর্গাপূজা সম্পন্ন করাই এখন প্রশাসনের মূল লক্ষ্য। এ জন্য দুই পক্ষকেই মুচলেকা দেওয়ার মাধ্যমে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার কথা বলা হয়েছে।
খায়রুল হাসান বলেন, “বিষয়টি আদালতের এখতিয়ারাধীন। আদালতের নির্দেশনাকে গুরুত্ব দিয়েই আমরা পরিস্থিতি দেখছি। একই সঙ্গে সবাই যেন নির্বিঘ্নে পূজা করতে পারেন, সেটিও নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পূজা বন্ধ করার কথা বলা হয়নি।”
জমির বিরোধের নিষ্পত্তি এখনো হয়নি
দুই পক্ষের বক্তব্য ও আদালতে দাখিল করা নথি অনুযায়ী, বিরোধটির একটি দিক জমির কবুলিয়াত, দখল ও ব্যবহারের অধিকারসংক্রান্ত। অন্যদিকে সামনে দুর্গাপূজা থাকায় একই জায়গায় ধর্মীয় অনুষ্ঠান শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মণ্ডল পরিবারের দাবি, ৯৯ বছরের সরকারি কবুলিয়াতের ভিত্তিতে ৩৭ শতাংশ জমি তারা বৈধভাবে ব্যবহার করছে। বিপরীতে স্থানীয়দের একাংশের বক্তব্য, ওই জমির একটি অংশ প্রায় চার দশক ধরে সর্বজনীন দুর্গা মন্দির ও ধর্মীয় কাজে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
তবে জমির ব্যবহার ও দখল নিয়ে দুই পক্ষের এসব দাবির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এখনো হয়নি। বিষয়টি আদালতে থাকায় জমির আইনগত অবস্থান, কবুলিয়াতের শর্ত এবং কে কতটুকু অংশ ব্যবহার করতে পারবেন, সেসব বিষয়ে আদালত ও সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের পরবর্তী সিদ্ধান্তই গুরুত্বপূর্ণ হবে।
এর মধ্যে আসন্ন দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের উত্তেজনা বা সংঘাত এড়াতে পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসন দুই পক্ষকে নিয়ে সমঝোতার চেষ্টা চালাচ্ছে। প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, জমির বিরোধের নিষ্পত্তি আদালতের প্রক্রিয়ায় হবে; তবে সেই বিরোধের কারণে যাতে ধর্মীয় অনুষ্ঠান ব্যাহত বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি না ঘটে, আপাতত সেদিকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ সময়: ২৩:৫৩:০৩ ২৮ বার পঠিত