বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬

পিএসজি হতে পারে ক্লাব ফুটবলের রোল মডেল

প্রথম পাতা » খেলাধুলা » পিএসজি হতে পারে ক্লাব ফুটবলের রোল মডেল
বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬



পিএসজি হতে পারে ক্লাব ফুটবলের রোল মডেল

যেকোন দেশের মূল পরিচিতি তার জাতীয় দলের মাধ্যমে হলেও সেই দলকে গড়ে তোলার মূল ভিত্তি যুব দল বা একাডেমি দল। বিশ্বের বড় সব ক্লাবই তাদের একাডেমিকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে মূল দল এবং পরবর্তীতে জাতীয় দলের জন্য খেলোয়াড় তৈরীর একটি পথ তৈরী করে দেয়। ফ্রান্সও তার ব্যতিক্রম নয়। সেই লক্ষ্যেই ফরাশি শীর্ষ ক্লাব প্যারিস সেইন্ট জার্মেই (পিএসজি) ক্রমেই উন্নতির শিখরে পৌঁছে যাচ্ছে। যার প্রমান ক্লাবটির দীর্ঘদিনের লক্ষ্য চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়।

পিএসজির মূল দল ও একাডেমির মধ্যকার দূরত্ব এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে কম। ক্লাবটির ‘এসপোয়ার’ দল এবং ইয়ুথ লিগের কল্যাণে এই অগ্রগতি সম্ভব হচ্ছে। ইয়ুথ লিগ এখন আর কেবল একটি প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ নেই।

তরুণ খেলোয়াড়দের গড়ে তোলার ক্ষেত্রে পিএসজির এই উদ্যোগের সুফলও মিলতে শুরু করেছে। প্রকল্পটি সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিয়েছেন পিএসজি একাডেমির ক্রীড়া পরিচালক ইয়োহান কাবায়ে।

পিএসজির কাছে ইয়ুথ লিগ কেবল জেতার জন্য একটি ট্রফি নয়, যদিও প্রথমবারের মতো এই শিরোপা জেতা ক্লাবটির অন্যতম লক্ষ্য। তাদের পরিকল্পনা আরও বিস্তৃত। প্রতিটি ম্যাচই ক্যাম্পাসে বেড়ে ওঠা তরুণ খেলোয়াড়দের বিকাশের আরেকটি ধাপ। ম্যাচের পর ম্যাচ তাদের পেশাদার ফুটবলের ক্রীড়াগত, কৌশলগত ও মানসিক চাহিদার জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে।

তবে প্রতিটি প্রতিযোগিতার মতো ইয়ুথ লিগেও যত দূর সম্ভব এগিয়ে যাওয়ার উচ্চাকাঙ্খা রয়েছে পিএসজির। ২০২৫-২৬ মৌসুমে ফরাসি ফুটবল ফেডারেশনের (এফএফএফ) র‌্যাঙ্কিংয়ে ফ্রান্সের সেরা পুরুষ একাডেমির স্বীকৃতি পায় ক্লাবটি। পিএসজি ২০২৪, ২০২৫ ও ২০২৬ সালে ফরাসি অনূর্ধ্ব-১৯ চ্যাম্পিয়ন হয়। ২০২৬ সালে ফরাসি অনূর্ধ্ব-১৭ শিরোপা ও কুপ গামবারদেলা জয়ের পাশাপাশি একই বছর উয়েফা ইয়ুথ লিগের শেষ চারে জায়গা করে নেয় তারা।

তবে এসব সাফল্যের পেছনে রয়েছে আরও বড় একটি লক্ষ্য, এমন খেলোয়াড় তৈরি করা, যারা একসময় মূল দলে জায়গা করে নিতে পারবেন। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতিমঞ্চ হিসেবে কাজ করছে ইয়ুথ লিগ। এই প্রতিযোগিতার গতি, তীব্রতা ও পরিবেশ অনেকটাই চ্যাম্পিয়ন্স লিগের কাছাকাছি।

তাহলে ইয়ুথ লিগ কি খেলোয়াড় গড়ে তোলার মাধ্যম, নাকি জেতার মতো একটি ট্রফি? কাবায়ে এ দুটির মধ্যে একটিকে বেছে নিতে রাজি নন।

পিএসজি একাডেমির ক্রীড়া পরিচালক বলেন, “নিশ্চিতভাবেই এটি খেলোয়াড়দের বিকাশের একটি মাধ্যম। এই প্রতিযোগিতায় আমাদের খেলোয়াড়েরা বিভিন্ন প্রতিপক্ষ, খেলার ধরন ও পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। এতে তাদের মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা এবং উচ্চ চাহিদার মধ্যে নিজেদের সাড়া দেওয়ার সামর্থ্য মূল্যায়নের সুযোগ পাই আমরা।

“তবে এটি একটি প্রতিযোগিতাও। আর পিএসজির হয়ে খেললে জয়ের লক্ষ্য থাকতেই হবে। ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ। কারণ চাপ সামলানো এবং গুরুত্বপূর্ণ জয় নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় কাজগুলো করতে পারাও একেকটি দক্ষতা। এটিও শেখার প্রক্রিয়ার অংশ। প্রতিযোগিতাটি আমাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষার জায়গা, আর এটি জয়ের চেষ্টা করতে গিয়ে যে পথ পাড়ি দিতে হয়, সেটিও খেলোয়াড়দের বিকাশের মাধ্যম। এক ম্যাচ থেকে আরেক ম্যাচে আমাদের দল সব সময় এক রকম থাকে না, আর এভাবেই নতুন খেলোয়াড় উঠে আসে।”

গত মৌসুমের পরিসংখ্যান এই উদ্যোগের কার্যকারিতা তুলে ধরে। পিএসজির একাডেমি থেকে উঠে আসা ১০ জন খেলোয়াড় গত মৌসুমে মূল দলের হয়ে অন্তত একটি ম্যাচ খেলেছেন। তাঁদের মধ্যে ছয়জনের মূল দলে অভিষেক হয়েছে। তাদের সবার মধ্যে একটি মিল রয়েছে, তারা ইয়ুথ লিগে খেলেছেন। ওই প্রতিযোগিতায় এক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো সেমিফাইনালে উঠেছিল পিএসজি।

ঘরোয়া প্রতিযোগিতার বাইরেও ইয়ুথ লিগ কী ধরনের অভিজ্ঞতা দেয়, তা ব্যাখ্যা করে কাবায়ে বলেন, “ধারাবাহিকতার প্রশ্নে ঘরোয়া লিগ এখনো অপরিহার্য, কারণ সেখানে প্রতি সপ্তাহান্তে খেলতে হয়। ইয়ুথ লিগ খেলোয়াড়দের জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি অভিজ্ঞতা। সেখানে আমরা এমন দলগুলোর মুখোমুখি হই, যাদের কাজের ধরন আলাদা, যাদের মানদন্ড ভিন্ন এবং যাদের ফুটবল সংস্কৃতিও অন্য রকম। ফলে আমাদের দ্রুত মানিয়ে নিতে হয়।

“ঘরোয়া লিগের তুলনায় এই প্রতিযোগিতা খেলোয়াড়দের চাপের মধ্যে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে বেশি শেখায়। কীভাবে তারা নিজেদের আধিপত্যের সময় এবং কঠিন পরিস্থিতি সামলায়, কীভাবে কখনো কখনো প্রতিকূল পরিবেশেও কার্যকর থাকে এসবই তারা শেখে। এই পর্যায়ে একটি ভুলের চড়া মূল্য দিতে হতে পারে।

“ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ভ্রমণের অভিজ্ঞতাও রয়েছে দলটির। যেমন আজ আমরা ইংল্যান্ডে যাচ্ছি এবং ম্যাচের আগের দিন রওনা হচ্ছি। উয়েফার প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতাও হয়। পাশাপাশি আবেগের বিষয়টিও রয়েছে, যা সর্বোচ্চ পর্যায়ের ফুটবলে ক্যারিয়ার গড়ে তুলতে কী প্রয়োজন, তা শেখার অংশ।”

ইউরোপের সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রতিযোগিতাতেও এই উদ্যোগের সুফল দেখা যাচ্ছে। একাডেমি থেকে উঠে আসা চার খেলোয়াড় ওয়ারেন জায়ার-এমেরি, সেনি মায়ুলু, কোয়েন্তা এনজানতু ও ইব্রাহিম এমবায়ে চ্যাম্পিয়নস লিগে খেলেছেন। ২০১৮-১৯ মৌসুমের পর থেকে পিএসজির একাডেমি-স্নাতকদের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ সংখ্যা। তরুণ খেলোয়াড়দের মূল দলে উঠে আসার ক্ষেত্রে এটি ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত।

কাবায়ে বলেন, “ইয়ুথ লিগের ম্যাচ যে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ম্যাচের সমতুল্য নয়, তা নিশ্চিত। তবে সর্বোচ্চ পর্যায়ের ফুটবলের কাছাকাছি যেতে যে মৌলিক আচরণ ও দক্ষতা প্রয়োজন, সেগুলো নিয়ে কাজ করার সুযোগ দেয় এই প্রতিযোগিতা। আমাদের খেলোয়াড়েরা নিজেদের উন্নয়নের ধারাবাহিক পথের অংশ হিসেবে প্রতি বছর ইয়ুথ লিগে খেলতে পারে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”

পিএসজির এই কাঠামোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো এসপোয়ার দল। ক্লাবের নিজস্ব উদ্যোগে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে দলটি গঠন করা হয়। বর্তমানে এটি একাডেমির কেন্দ্রীয় দল হিসেবে কাজ করছে। তরুণ খেলোয়াড়দের পেশাদার ফুটবলে প্রবেশের পথ তৈরি করাই এর প্রধান ভূমিকা।

অনূর্ধ্ব-১৬ থেকে অনূর্ধ্ব-২৩ পর্যায় পর্যন্ত খেলোয়াড়দের উপযুক্ত পরিবেশ ও পর্যাপ্ত খেলার সুযোগ দিয়ে লুইস এনরিকের মূল দলের সঙ্গে একাডেমির সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করছে এই দল।

কাবায়ে ব্যাখ্যা করেন, “দলটি ২০২৪ সালের গ্রীষ্মে গঠন করা হলেও এর পেছনের চিন্তাভাবনা শুরু হয়েছিল আরও আগে। আমরা দুটি সমস্যার সমাধান করতে চেয়েছিলাম। প্রথমটি ছিল পেশাদার ফুটবলে উত্তরণের বিষয়টি। অনূর্ধ্ব-১৯ দল ও মূল দলের মধ্যে বেশ বড় একটি ব্যবধান ছিল।

“কিছু খেলোয়াড়ের উন্নতির জন্য আরও সময় ও বেশি প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ প্রয়োজন ছিল। অন্যদিকে, কেউ কেউ পরবর্তী ধাপে ওঠার জন্য বেশি প্রস্তুত ছিল এবং সর্বোচ্চ পর্যায়ের ফুটবলের আরও কাছাকাছি যেতে পারত। তাই যাদের প্রয়োজন, তাদের জন্য মাঝখানে আরেকটি ধাপ তৈরির চিন্তা আসে।

“দ্বিতীয় সমস্যাটি ছিল খেলার সুযোগ। এই তৃতীয় দলটি একাডেমির সব খেলোয়াড়কে মাঠে নামার সুযোগ দেয়। আগে যখন আমাদের কেবল অনূর্ধ্ব-১৭ ও অনূর্ধ্ব-১৯ দল ছিল, তখন অনূর্ধ্ব-১৬ পর্যায়ের খেলোয়াড়েরা খুব কমই খেলার সুযোগ পেত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তারা অনেক বেশি খেলার সুযোগ পাচ্ছে।”

পুরো ব্যবস্থাটি গড়ে তোলা হয়েছে ধারাবাহিকতার ওপর ভিত্তি করে। অনূর্ধ্ব-১৯ ও এসপোয়ার দলের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় রয়েছে। দুই দলের কোচ জ্যঁ-ফ্রাঁসোয়া ভলিয়েজ ও থমাস লেসালেস নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন।

এর লক্ষ্য হলো, প্রতিটি খেলোয়াড়ের অগ্রগতি দীর্ঘ সময় ধরে পর্যবেক্ষণ করা এবং এক বয়সভিত্তিক দল থেকে অন্য দলে যাওয়ার সময় যেন কাজের ধারাবাহিকতা ব্যাহত না হয় কিংবা কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হারিয়ে না যায়, তা নিশ্চিত করা।

পিএসজির ক্যাম্পাসে গত দুই মৌসুমে মূল দলের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ অভিযান তরুণ খেলোয়াড়দের অনুপ্রেরণার বড় উৎস হয়ে উঠেছে। ইউরোপের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ক্লাবকে খেলতে দেখা তাদের প্রতিদিনের পরিশ্রমকে অর্থবহ করে তুলেছে। মূল দলে খেলার লক্ষ্য এখন তাদের কাছে বাস্তব ও স্পষ্ট। তারা নিজেদের সেই পর্যায়ে কল্পনা করতে পারে এবং সেখানে পৌঁছাতে কতটা নিষ্ঠা ও পরিশ্রম প্রয়োজন, তা বুঝতে পারে।

এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে একটি অভিন্ন পরিকল্পনা। ক্লাব সভাপতি নাসের আল-খেলাইফি, ক্রীড়া উপদেষ্টা লুইস কাম্পোস, প্রধান কোচ লুইস এনরিকে এবং কাবায়ে- সবাই এই পরিকল্পনায় যুক্ত।

কাবায়ের মতে, এ ক্ষেত্রে ক্যাম্পাসই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, “বর্তমানে ক্যাম্পাসই আমাদের সবচেয়ে বড় সুবিধা। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এটিকে ফিরিয়ে আনতে হবে। সভাপতির দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে এই কর্মপরিবেশ গড়ে তোলার ফলে আমরা একে অপরের কাছাকাছি থাকতে পারছি এবং অভিন্ন ক্রীড়া পরিকল্পনা তৈরি করতে পারছি। একাডেমিতে কী হচ্ছে, তা নিয়ে লুইস কাম্পোস ও আমার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ প্রকল্পটির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”

দুজন প্রতিদিনই কথা বলেন। পাশাপাশি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও খেলোয়াড়দের নিয়ে আনুষ্ঠানিক বৈঠকও করেন তাঁরা।

কাবায়ের ভূমিকা অনেকটা প্রতিভা খুঁজে বের করা পর্যবেক্ষকের মতো। তিনি বলেন, “যেসব খেলোয়াড়কে পর্যবেক্ষণ করা এবং বিশেষ নজরে রাখা প্রয়োজন, তাদের সম্পর্কে জানানো আমার দায়িত্ব। কোনো খেলোয়াড় মাঝেমধ্যে মূল দলের দরজায় কড়া নাড়তে এবং নিজের সামর্থ্য দেখাতে পারবে কি না, তা বোঝার চেষ্টা করি আমি।”

এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পর্দার আড়ালেও বিভিন্ন বিভাগের কর্মীদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হয়। ভিডিও বিশ্লেষক, তথ্য বিশ্লেষক, পুষ্টিবিদ, ফিটনেস কোচ ও চিকিৎসক দল- সবাই খেলোয়াড়দের উন্নয়নে নিজেদের দক্ষতা কাজে লাগান।

পিএসজির মূল দল ও যুবদলের মধ্যে সম্পর্ক এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে শক্তিশালী। সবকিছুর মূলে একটাই লক্ষ্য চ্যাম্পিয়ন্স লিগসহ যেকোন বড় আয়োজনে পিএসজির সর্বোচ্চ সাফল্য, যাতে খেলোয়াড়রাই মূল নিয়ামক হিসেবে কাজ করে।

বাংলাদেশ সময়: ১৮:১১:২৫   ১০ বার পঠিত