
জাত-পাত, ধর্ম-বর্ণ ও সামাজিক শ্রেণির বিভেদ ভুলে মানবিক মূল্যবোধ, সাম্য ও সহমর্মিতার ভিত্তিতে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে ফকির লালন সাঁইয়ের মানবতাবাদী দর্শন গুরুত্বপূর্ণ প্রেরণা জোগাবে বলে মন্তব্য করেছেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম।
তিনি বলেন, ফকির লালন সাঁই কেবল একজন বাউল সাধক বা সুরস্রষ্টা ছিলেন না; তিনি ছিলেন বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনা, সাম্য ও মানবতার এক মহান প্রবক্তা। সমাজ ও রাজনীতিতে যখন ভেদাভেদ, সংকীর্ণতা ও বিভাজনের প্রবণতা দেখা দেয়, তখন লালনের মানবতাবাদী দর্শন মানুষকে সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের পথ দেখায়।
লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে আজ শনিবার আয়োজিত ‘লালন স্মরণানুষ্ঠানে’ প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি এ স্মরণানুষ্ঠানের আয়োজন করে।
আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম বলেন, ফকির লালন সাঁই তার জীবন, সাধনা ও গানের মধ্য দিয়ে মানুষের প্রকৃত পরিচয়কে প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। তিনি জাত-পাত, ধর্ম-বর্ণ কিংবা সামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতে মানুষকে বিভক্ত করার ধারণার ঊর্ধ্বে উঠে মানবিক পরিচয়কে গুরুত্ব দিয়েছেন। তার দর্শনের মূল কথা হলো, মানুষের মধ্যে বিভেদ নয়, বরং ভালোবাসা, সাম্য ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ প্রতিষ্ঠা করা।
লালনের কালজয়ী গানের কথা উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে, লালন কয় জাতের কি রূপ দেখলাম না এ নজরে’-এই উচ্চারণের মধ্য দিয়ে তিনি জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষকে বিচার করার প্রবণতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। তার এই উপলব্ধি শুধু একটি গানের বাণী নয়; বরং মানুষের মধ্যে বিদ্যমান বিভেদ ও বৈষম্য দূর করার একটি গভীর মানবিক বার্তা। বর্তমান সময়েও দেশের সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে এ দর্শনের গুরুত্ব অপরিসীম।
তিনি বলেন, মানুষের মধ্যে ধর্মীয়, সামাজিক ও শ্রেণিগত বিভাজন দূর করতে লালনের জীবনদর্শন নতুন করে উপলব্ধি করা প্রয়োজন। তার গান ও সাধনার মধ্য দিয়ে যে অসাম্প্রদায়িক মানবিক চেতনার প্রকাশ ঘটেছে, তা সমাজে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের কাছে লালনের দর্শন তুলে ধরা গেলে তারা মানুষকে পরিচয় বা অবস্থানের ভিত্তিতে নয়, বরং মানবিক মূল্যবোধের আলোকে মূল্যায়ন করতে শিখবে।
সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের রয়েছে সুপ্রাচীন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও সমৃদ্ধ লোকসংস্কৃতি। এ ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ফকির লালন সাঁইয়ের গান, দর্শন ও সাধনা। আবহমান বাংলার লোকজ সংস্কৃতি দেশের মানুষের জীবনবোধ, চিন্তা ও মননকে সমৃদ্ধ করেছে। এই ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে যথাযথভাবে পৌঁছে দেওয়া সরকারের পাশাপাশি সমাজের সবার সম্মিলিত দায়িত্ব।
তিনি আরও বলেন, সরকার ও সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় বাংলাদেশের ঐতিহ্য, লোকসংস্কৃতি এবং অসাম্প্রদায়িক ভাবধারা সংরক্ষণ ও বিকাশে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে এগিয়ে নিতে লালন সাঁইয়ের মতো মনীষীদের জীবন, কর্ম ও দর্শন নিয়ে চর্চা বাড়ানো প্রয়োজন। তাদের সৃষ্টিকর্মের মধ্য দিয়ে যে মানবিক ও উদার জীবনবোধ প্রকাশ পেয়েছে, তা নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, লালন সাঁই মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা, সাম্য ও মানবতার যে শিক্ষা দিয়ে গেছেন, তা সমাজের প্রতিটি স্তরে চর্চা করা প্রয়োজন। কেবল আনুষ্ঠানিক স্মরণানুষ্ঠানের মধ্যে তার দর্শনকে সীমাবদ্ধ না রেখে দৈনন্দিন জীবন, সামাজিক আচরণ ও রাষ্ট্রীয় চিন্তায় এর প্রতিফলন ঘটাতে হবে। মানুষের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও সহযোগিতার মনোভাব গড়ে উঠলে একটি মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হবে।
তিনি বলেন, সাম্য ও সহমর্মিতার দর্শনে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে লালনের বাণী সবসময় প্রেরণা জোগাবে। তার অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক মূল্যবোধ ধারণ করে একটি বৈষম্যহীন, সৌহার্দ্যপূর্ণ ও সুসংহত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
ফকির লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এ স্মরণানুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে তার জীবন, সাধনা ও মানবতাবাদী দর্শন নতুন করে স্মরণ করার পাশাপাশি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনা বিকাশের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়।
বাংলাদেশ সময়: ২৩:১৩:৫৬ ১০ বার পঠিত