রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬

ভেজাল শিশুখাদ্যে সয়লাব বাজার: বিষাক্ত জেলি-চকলেটে হুমকিতে কোমলমতি শিশুরা

প্রথম পাতা » ছবি গ্যালারী » ভেজাল শিশুখাদ্যে সয়লাব বাজার: বিষাক্ত জেলি-চকলেটে হুমকিতে কোমলমতি শিশুরা
রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬



ভেজাল শিশুখাদ্যে সয়লাব বাজার: বিষাক্ত জেলি-চকলেটে হুমকিতে কোমলমতি শিশুর

দেশের বাজারগুলো বর্তমানে ভেজাল ও বিষাক্ত শিশুখাদ্যে সয়লাব হয়ে গেছে। কৃত্রিম রং, ক্ষতিকর ফ্লেভার এবং বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান মিশিয়ে প্রকাশ্যেই তৈরি হচ্ছে জেলি, জুস ও আইস ললির মতো মুখরোচক খাবার। এর চেয়েও ভয়ংকর চিত্র দেখা গেছে চকলেট ও সন্দেশ তৈরির কারখানাগুলোতে, যেখানে পচা মিষ্টির সিরা ও নষ্ট দই ব্যবহার করা হচ্ছে।

সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে রাজধানী ও এর আশেপাশের এলাকায় শিশুখাদ্য উৎপাদনের এই ভয়ংকর চিত্র উঠে এসেছে।
কারখানায় নেই কোনো ফল, তৈরি হচ্ছে কৃত্রিম জেলি-জুস

অনুসন্ধানে জানা যায়, রূপগঞ্জের একটি কারখানায় আম, লিচু ও আনারসের মতো বিভিন্ন ফলের জেলি, জুস ও আইস ললি তৈরি হলেও পুরো কারখানায় ফলের ছিটেফোঁটাও মেলেনি। কারখানার ভেতরে গিয়ে ক্যামেরায় ধরা পড়ে—আসল ফলের পরিবর্তে রাসায়নিক উপাদান ও ক্ষতিকর টেক্সটাইল কালার বা রং ব্যবহার করে এসব খাবার তৈরি করা হচ্ছে।

আরেকটি কক্ষে দেখা যায় আরও ভয়াবহ চিত্র। সেখানে স্তূপ করে রাখা ময়লা-আবর্জনা ও পচা পণ্যের মাঝ থেকেই জেলি বের করছেন শ্রমিকরা। পরবর্তীতে এসব অস্বাস্থ্যকর জেলি প্যাকেটজাত করে বাজারে ছাড়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়।
পচা সিরা ও পোকায় ভরা উপাদানে তৈরি হচ্ছে চকলেট-সন্দেশ

সাভারের আরেকটি কারখানায় শিশুদের পছন্দের চকলেট ও সন্দেশ তৈরির নামে চলছে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরির প্রক্রিয়া। সেখানে অসংখ্য ড্রামে জমিয়ে রাখা হয়েছে ৫ থেকে ৬ দিন আগের পচা মিষ্টির সিরা। প্যাকেটের গায়ে দুধ ও চিনির কথা লেখা থাকলেও ড্রামগুলোতে মিলছে পচা সিরা ও নষ্ট দই, যার মধ্যে মরে পচে আছে মাছি ও বিভিন্ন পোকামাকড়।

নষ্ট ও পোকাযুক্ত এসব উপাদান গরম করেই তৈরি হচ্ছে সন্দেশ ও চকলেট। কারখানার পরিবেশ এতটাই নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর যে চারদিকে তীব্র দুর্গন্ধে টেকা দায়।

কারখানার এক কর্মী জানান, বিভিন্ন মিষ্টির দোকান থেকে ফেলে দেওয়া বর্জ্য বা সিরা সংগ্রহ করে আটার সাথে মিশিয়ে জ্বাল দেওয়া হয়। এতেই কৃত্রিমভাবে মিষ্টির স্বাদ ও ফ্লেভার চলে আসে।
প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ’ করে চলছে অবৈধ ব্যবসা!

কারখানার মালিক পরিচয়ে দু’জন ব্যক্তি সাংবাদিকের মুখোমুখি হয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য জানান। তারা স্বীকার করেন যে, প্রশাসনের নজর এড়িয়ে নয়, বরং নিয়মিত উৎকোচ বা ‘টাকা দিয়ে ম্যানেজ’ করেই তারা এসব অবৈধ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। এমনকি সংবাদ প্রকাশ থেকে বিরত রাখতে সংবাদকর্মীদেরও টাকা দিতে চান তারা। তাদের একজন বলেন, কিছু টাকা-পয়সা দিই, গরিব মানুষ, আমাদের নিউজটি করে ক্ষতি করবেন না।
মূল উৎপাদন ও পাইকারি গন্তব্য

শুধু রূপগঞ্জ বা সাভার নয়; রাজধানীর কামরাঙ্গীরচর, কেরানীগঞ্জ ও আশুলিয়ার বিভিন্ন অলিগলিতেও গড়ে উঠেছে এমন অবৈধ শিশুখাদ্য কারখানা। এসব কারখানায় উৎপাদিত বিষাক্ত পণ্যগুলোর মূল পাইকারি গন্তব্য পুরান ঢাকার চকবাজার। সেখান থেকেই এসব খাবার দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে।

মুদি দোকানিদের দাবি, তারা বিক্রি বন্ধ করলেও অন্য দোকান থেকে ঠিকই এসব পণ্য বিক্রি হবে। এক দোকানি বলেন, ‘আমি না বিক্রি করলে অন্যজন করবে। এগুলো বিক্রি করলেও আমি আমার নিজের বাচ্চাকে কখনো এগুলো খাওয়াই না।’
নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও হতাশা

শিশুখাদ্যের এই ভয়াবহ পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য (খাদ্যশিল্প ও উৎপাদন) অধ্যাপক মোহাম্মদ শোয়েব বলেন, ‘আমরা ভেজালবিরোধী বিভিন্ন অভিযান পরিচালনা করছি, তারপরও এগুলো কমছে না। এর মূল কারণ উৎপাদকদের অসততা। সরকারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এককভাবে এ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়; এর জন্য সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।’

খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে খুচরা বিক্রি—সবকিছু প্রকাশ্যে চললেও কার্যকর তদারকি ও কঠোর আইনের প্রয়োগের ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞরা। শিশুদের কোমল প্রাণ ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় অবিলম্বে এসব ভেজাল কারখানা উচ্ছেদ এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিক সমাজ।

বাংলাদেশ সময়: ১২:৩১:১২   ৩৭ বার পঠিত