![]()
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে ‘জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫’ বাস্তবায়নে স্পষ্ট, দ্ব্যর্থহীন ও পূর্ণাঙ্গ অঙ্গীকার চায় সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। সুজনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলো গণভোটের ক্ষেত্রে ‘হ্যাঁ’ নাকি ‘না’ ভোটের পক্ষে, তা ইশতেহারে সুস্পষ্ট করতে হবে। যদিও দলগুলো জুলাই জাতীয় সনদে সংস্কার বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছে, কিন্তু তাদের ইশতেহারেও এটি সুস্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ থাকতে হবে।
শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষায় কেমন ইশতেহার চাই?’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এ বক্তব্য তুলে ধরা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘নির্বাচনী ইশতেহার একটি লিখিত চুক্তি। স্বাক্ষরিত না হলেও এটি ভোটারদের সঙ্গে দলগুলোর চুক্তি। এই চুক্তি অমান্য করলে যেন নাগরিকদের আদালতে যাওয়ার সুযোগ থাকে। মানুষ যেন প্রশ্ন করার সুযোগ পায় যে দলগুলো তাদের অঙ্গীকার কতটা বাস্তবায়ন করেছে।
তিনি আরো বলেন, “নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ ‘দিনবদলের সনদ’ নামে একটি ইশতেহার দিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সেই অঙ্গীকার ভুলে গেছে। তার মাসুলও দিতে হয়েছে দলটিকে।”
বিগত নির্বাচনগুলোতে জয়ী প্রার্থীদের সম্পদ বৃদ্ধির বিষয়টি তুলে ধরেন বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘ক্ষমতার সঙ্গে জাদুর কাঠি রয়েছে।
রাজনীতিবিদদের জানাতে হবে, ক্ষমতায় যাওয়ার মাধ্যমে অর্থবিত্তের মালিক হওয়ার যে সুযোগ, রাজনীতির ব্যবসায়ীকরণ ও ব্যবসায়ের রাজনীতিকরণের অবসান তারা কিভাবে ঘটাবেন।’
তিনি আরো বলেন, ‘রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা নির্ভর করে রাষ্ট্র কতটা জবাবদিহিমূলক তার ওপর। অতীতে ভীতি সঞ্চারের মাধ্যমে শাসনের সংস্কৃতি গড়ে ওঠায় জনগণ সরকারি বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল। ভবিষ্যতে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনে রাষ্ট্রযন্ত্রের অপব্যবহার রোধে টেকসই ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকার ইশতেহারে থাকতে হবে।’
রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নিবন্ধন শর্ত অনুযায়ী অঙ্গসংগঠন বিলুপ্ত না করে শুধু গঠনতন্ত্র থেকে নাম সরিয়ে আইনের মূল উদ্দেশ্যকে ভণ্ডুল করে দিয়েছে বলে মন্তব্য করেন ড. বদিউল আলম মজুমদার।
তিনি বলেন, ‘আইনে স্পষ্টভাবে বলা আছে–কোনো রাজনৈতিক দলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান-শিক্ষক, ছাত্র-শ্রমিক, কর্মচারী বা অন্যান্য পেশার সহযোগী বা অঙ্গসংগঠন থাকা যাবে না। বিদেশি শাখার বিধানও থাকবে না। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো এই শর্ত অমান্য করে, শুধু গঠনতন্ত্র থেকে নাম সরিয়েছে। এ ধরনের অঙ্গসংগঠন দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কার্যত রণক্ষেত্রে পরিণত করে এবং মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠা করতে বাধা সৃষ্টি করেছে। রাজনৈতিক দলগুলো এবারে আইন ও সংবিধান মেনে স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীল অবস্থান নেবে।’
সংবাদ সম্মেলনে মূল বক্তব্য তুলে ধরেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিকসের অধ্যাপক ও ডিন ড. এ কে এম ওয়ারেসুল করিম। তিনি বলেন, ‘চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা নয়, এটি ছিল রাষ্ট্র মেরামতের লক্ষ্যে ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব জাগরণ এবং তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষার এক তীব্র বিস্ফোরণ। এই অভ্যুত্থান প্রমাণ করেছে জনগণ আর নীরব দর্শক থাকতে রাজি নয় এবং তারা অবিচার, বৈষম্য ও জবাবদিহিহীনতার উত্তরাধিকার বহন করতে চায় না। জনগণ চায় অংশগ্রহণমূলক, মর্যাদাভিত্তিক ও ন্যায়সংগত গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ।’
ড. ওয়ারেসুল করিম বলেন, ‘নির্বাচন সামনে রেখে বড় রাজনৈতিক দলগুলো একাধিক জোট গঠনে উদ্যোগী হলেও এসব জোট আদর্শিক নাকি, কেবল নির্বাচনী সমঝোতা তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, জনগণ তত বেশি জানতে চায়—নির্বাচনে জয়ী হলে দলগুলো কী করবে, কিভাবে করবে এবং কখন করবে, যার স্পষ্ট প্রতিফলন নির্বাচনী ইশতেহারে থাকা জরুরি।’
তিনি বলেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদে সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন, পুলিশি ব্যবস্থা ও দুর্নীতি দমন ব্যবস্থার সংস্কার সংক্রান্ত যেসব সিদ্ধান্ত রয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় সংবিধান সংশোধন, আইন প্রণয়ন ও বিধি-বিধান পরিবর্তনের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ইশতেহারে থাকতে হবে।’
গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার প্রসঙ্গে ড. ওয়ারেসুল করিম বলেন, গণতন্ত্র শুধু নির্বাচন দিয়ে টিকে থাকে না; এটি টিকে থাকে শক্তিশালী ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সহনশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতির মাধ্যমে। বিচার বিভাগের চলমান সংস্কারকে স্বাগত জানালেও নির্বাচন কমিশন, পাবলিক সার্ভিস কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও তথ্য কমিশনসহ অন্যান্য সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের সংস্কার জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম আকাঙ্ক্ষা। সরকার পরিবর্তন হলেও যাতে জনগণের মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত থাকে, সে জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক করার অঙ্গীকার ইশতেহারে উল্লেখ করার আহ্বান জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন সুজনের কোষাধ্যক্ষ সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ, নির্বাচন কার্যক্রম সমন্বয়ক একরাম হোসেন ও কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার।
বাংলাদেশ সময়: ১৭:৪২:০৬ ১১ বার পঠিত