
বন্দর উন্নয়ন, নৌযোগাযোগ সম্প্রসারণ ও শিপিং খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরেছেন নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন।
মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে সংবাদ সম্মেলনে ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত মন্ত্রণালয়টির এবং এর আওতাধীন দফতর ও সংস্থাগুলোর কার্যক্রম ও অর্জনের সারসংক্ষেপ তুলে ধরেন তিনি।
উপদেষ্টা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং আধুনিকায়নমূলক সিদ্ধান্তের ফলে দেশের নৌখাত আজ একটি শক্তিশালী, নিরাপদ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন খাতে রূপান্তরিত হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, চট্টগ্রাম বন্দরে ভারী কার্গো হ্যান্ডেলিংয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে লালদিয়া এলাকায় হেভি লিফট কার্গো জেটি নির্মাণ প্রকল্প চলমান রয়েছে, যা বাংলাদেশ নৌবাহিনীর মাধ্যমে বাস্তবায়িত হচ্ছে। পাশাপাশি পিপিপি মডেলে লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য এপিএম টার্মিনালস বিভি’র ৩৩ বছরের কনসেশন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যা ২০২৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে অপারেশনে যাওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ে বন্দরের রাজস্ব আয় হয়েছে ২ হাজার ৩৭৮ কোটি ৭৭ লাখ টাকা, ব্যয় ৮৩৭ কোটি ৯৯ লাখ টাকা এবং উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫৪০ কোটি ৮ লাখ টাকা। কনটেইনার, কার্গো ও জাহাজ হ্যান্ডলিংয়ে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে এবং ২০২৫ সালে চট্টগ্রাম বন্দরে ইতিহাসের সর্বোচ্চ কনটেইনার ও কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ডে আইএসপিএস অডিটে ‘জিরো অবজারভেশন’ অর্জন বন্দরের নিরাপত্তা সক্ষমতার স্বীকৃতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
উপদেষ্টা জানান, মোংলা বন্দরের পশুর চ্যানেলে সংরক্ষণ ড্রেজিং প্রকল্প একনেকে অনুমোদনের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের নাব্যতা সংকট নিরসনের পথ সুগম হয়েছে। একই সঙ্গে মোংলা বন্দরে আধুনিক বর্জ্য ও নিঃসৃত তেল অপসারণ ব্যবস্থাপনা (পিআরএফ) প্রকল্প উদ্বোধন করা হয়েছে, যা পরিবেশবান্ধব বন্দর ব্যবস্থাপনার একটি মাইলফলক।
পায়রা বন্দরে দেশী ও বিদেশী জাহাজ থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের মাধ্যমে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পেয়েছে। পিপিএফটি প্রকল্পের আওতায় সড়ক, ব্রিজ ও মোবাইল হারবার ক্রেন নির্মাণসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে।
বিআইডব্লিউটিসি ও বিআইডব্লিউটিএর উদ্যোগে কুতুবদিয়া, হাতিয়া, মহেশখালী, ভাসানচর ও অন্যান্য দ্বীপাঞ্চলে সি-ট্রাক ও ফেরি সার্ভিস চালু হওয়ায় দুর্গম এলাকার জনগণের যাতায়াত নিরাপদ, সহজ ও সময় সাশ্রয়ী হয়েছে। নতুন লঞ্চঘাট, পন্টুন ও জেটি স্থাপনের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ নৌপথে যোগাযোগ ব্যবস্থায় ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে।
দেশের প্রান্তিক মানুষের জীবনমান উন্নয়ন এবং যাত্রী সাধারণের সুষ্ঠু ও নির্বিঘ্নভাবে যাতায়াত এবং পণ্য পরিবহনের সুবিধার্থে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃক ত্রিশটির বেশি লঞ্চঘাট এবং পঞ্চাশটির বেশি পন্টুন স্থাপন করা হয়েছে বলে উপদেষ্টা জানান।
বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি) ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৩০৬ কোটি ৫৬ লাখ টাকা মুনাফা অর্জন করেছে এবং নতুন বাল্ক ক্যারিয়ার জাহাজ বহরে যুক্ত হওয়ায় আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে দেশের সক্ষমতা আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা আদায়ও সরকারের সাফল্যের অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়।
নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মাধ্যমে জিএমডিএসএস, কোস্টাল রেডিও স্টেশন ও লাইটহাউজ স্থাপনের ফলে উপকূলীয় এলাকায় নৌনিরাপত্তা জোরদার হয়েছে। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন নদ-নদীর অবৈধ দখল ও দূষণ রোধে আইনগত কাঠামো শক্তিশালী করার কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। পাশাপাশি মেরিন একাডেমি ও ন্যাশনাল মেরিটাইম ইনস্টিটিউটগুলোয় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ নাবিক ও মেরিটাইম জনবল তৈরিতে অগ্রগতি হয়েছে।
সমাপনী বক্তব্যে নৌপরিবহন উপদেষ্টা বলেন, নৌখাত কেবল পরিবহন ব্যবস্থাই নয়, এটি জাতীয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। আমাদের লক্ষ্য, দেশকে একটি আধুনিক, দক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন মেরিটাইম হাবে পরিণত করা। এ অর্জনগুলো সেই লক্ষ্যে আমাদের দৃঢ় অগ্রযাত্রার প্রতিফলন।
সংবাদ সম্মেলন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. নূরুন্নাহার চৌধুরীসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশ সময়: ২৩:২৫:৪৫ ৪ বার পঠিত