![]()
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত চার বছর পার হয়ে পঞ্চম বছরে গড়িয়েছে। এই সময়ে সংঘাতে লাখো প্রাণহানি হয়েছে। কোটি মানুষের বাস্তুচ্যুতি ঘটেছে। দখল হয়েছে বিপুল ভূখণ্ড। নজিরবিহীন নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক ব্যয়ে বদলে গেছে বৈশ্বিক অর্থনীতির চিত্র। চার বছরে কী হারাল ইউক্রেন, কী মূল্য দিল রাশিয়া তারই হিসাব থাকছে এই প্রতিবেদনে।
২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে পূর্ণ সামরিক অভিযান শুরু করে রাশিয়া। ইউক্রেনীয় বাহিনীর প্রতিরোধের মধ্যদিয়ে তা রক্তক্ষয়ী সংঘাতে রূপ নেয়। আজ মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) এই যুদ্ধ পঞ্চম বছরে গড়িয়েছে।
এই কয় বছরে বারকয়েক যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব উঠলেও তা কেবল আলোচনার টেবিলেই সীমিত থেকেছে। সমান্তরালে মাঠ পর্যায়ে দেখা গেছে লাখো প্রাণহানি, কোটি মানুষের বাস্তুচ্যুতি। এই হারজিতের হিসেব-নিকেশ উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে।
বিভিন্ন প্রতিবেদন মতে, রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয়ই শত্রুপক্ষের ক্ষয়ক্ষতি বেশি দেখায়, নিজেদের কম। তবুও সামগ্রিক চিত্র ভয়াবহ। ধারণা করা হয়, চার বছরে মোট হতাহতের সংখ্যা প্রায় ২০ লাখ। ইউক্রেনের জেনারেল স্টাফ দাবি করেছে, শুধু গত বছরই ৪ লাখ ১৮ হাজার রুশ সেনা হতাহত হয়েছে। এতে মোট রুশ হতাহত দাঁড়ায় ১২ লাখ ৫০ হাজারের বেশি।
ওয়াশিংটনভিত্তিক সিএসআইএস বলছে, ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত রাশিয়ার মোট হতাহত ১২ লাখের কাছাকাছি, যার মধ্যে অন্তত ৩ লাখ ২৫ হাজার নিহত।
আরও পড়ুন: পুতিন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু করে দিয়েছেন, তাকে থামাতে হবে: জেলেনস্কি
অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, যুদ্ধে ৫৫ হাজার ইউক্রেনীয় সেনা নিহত হয়েছে। সিএসআইএসের মতে, ইউক্রেনের মোট হতাহত ৬ লাখ পর্যন্ত, যার মধ্যে মৃত্যু ১ লাখ ৪০ হাজার হতে পারে। অগণিত বেসামরিক নাগরিকও হতাহত হয়েছেন।
ভূখণ্ডের দিক থেকেও বড় পরিবর্তন এসেছে। ২০২২ সালের মার্চে রাশিয়া ইউক্রেনের ২৬ শতাংশ ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণে নেয়। এর মধ্যে ছিল ২০১৪ সালে দখল করা ক্রিমিয়া এবং লুহানস্ক-দোনেৎস্কের বড় অংশ। পরের মাসে ইউক্রেন কিয়েভ, খারকিভ, সুমি ও চেরনিহিভ অঞ্চল পুনর্দখল করে। রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণ কমে দাঁড়ায় ২০ শতাংশে।
২০২২ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বরে ইউক্রেনীয় বাহিনী খারকিভ অঞ্চলে ওস্কিল নদীর পূর্বে রুশ বাহিনীকে পিছু হটায়। খেরসনে রাশিয়া দিনিপ্রো নদীর পূর্বে সরে যায়। নিয়ন্ত্রণ কমে ১৭.৮ শতাংশে। এরপর তিন বছর যুদ্ধ প্রায় স্থবির। ধীরে ধীরে অগ্রসর হয়ে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর নাগাদ রাশিয়া ১৯.৩ শতাংশ ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণে রাখে। এলাকা প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার বর্গকিলোমিটার।
দুই দেশের সামরিক ব্যয়েও দেখা গেছে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট বলছে, রাশিয়ার সামরিক ব্যয় ২০২১ সালে ছিল প্রায় ৬৬ বিলিয়ন ডলার। ২০২২ সালে তা বেড়ে ১০২ বিলিয়ন, ২০২৩ সালে ১০৯ বিলিয়ন এবং ২০২৪ সালে ১৪৯ বিলিয়নে পৌঁছে। ২০২৫ সালের হিসাব ভিন্ন।
কিছু বিশ্লেষক বলছেন, প্রথম ৯ মাসেই ১৪২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে। অন্যরা বলছেন, বাজেট ঘাটতি ও ঋণ কমার কারণে ব্যয় ১৫ শতাংশ কমেছে। ২০২৬ সালেও কমপক্ষে ৭ শতাংশ কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
ইউক্রেনের ব্যয়ও বেড়েছে। ২০২১ সালে ৬.৯ বিলিয়ন থেকে ২০২২ সালে ৪১ বিলিয়ন। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে ৬৫ বিলিয়ন করে। ২০২৫ সালে প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়িয়ে ৭১ বিলিয়ন ডলার করা হয়েছে। ২০২২ থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র মিলে ৩০০ বিলিয়নের বেশি সহায়তা দিয়েছে বলে জানায় গণমাধ্যম আল জাজিরা।
২০২৫ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর যুক্তরাষ্ট্র ৯৯ শতাংশ সহায়তা প্রত্যাহার করে। ইউরোপ সহায়তা দুই-তৃতীয়াংশ বাড়িয়ে শূন্যস্থান পূরণ করে। গত বছর ইউরোপ দিয়েছে প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলার, যুক্তরাষ্ট্র মাত্র ০. ৪ বিলিয়ন।
রাশিয়ার ওপর আর্থিক চাপও নজিরবিহীন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারের স্বর্ণ ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানে আটকে আছে। এর মধ্যে ২৩০ বিলিয়ন ডলার বেলজিয়ামে। রাশিয়া এই অর্থ ব্যবহার করতে পারছে না।
২০২৪ সালের মে মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়ন সিদ্ধান্ত নেয়, এই অর্থের সুদ ইউক্রেনকে দেয়া হবে। ৯০ শতাংশ যাবে সামরিক খাতে, ১০ শতাংশ পুনর্গঠনে। এছাড়া ৩৩ বিলিয়ন ডলারের রুশ ব্যক্তিগত সম্পদও জব্দ করা হয়েছে। চার বছরে এই যুদ্ধ শুধু মানচিত্র নয়, বদলে দিয়েছে মানবিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাও।
বাংলাদেশ সময়: ১১:৩৭:৫০ ৭ বার পঠিত