মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল ২০২৬

শিরীন শারমিনের রিমান্ড ও জামিন নামঞ্জুর, কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ

প্রথম পাতা » আইন আদালত » শিরীন শারমিনের রিমান্ড ও জামিন নামঞ্জুর, কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ
মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল ২০২৬



শিরীন শারমিনের রিমান্ড ও জামিন নামঞ্জুর, কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ

রাজধানীর লালবাগ থানার এক হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেপ্তার সাবেক স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর রিমান্ড ও জামিন না দিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা শুনানি শেষে এ আদেশ দেন।

এই মামলার শুনানিতে তিনি ২০ মিনিট কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। এ সময় তাকে বিষণ্ন চেহারায় নিশ্চুপ থাকতে দেখা গেছে।

এদিন দুপুর ১টা ৫৫ মিনিটে পুলিশি প্রহরায় তাকে আদালতে হাজির করা হয়। এ সময় তাকে সিএমএম আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়। এরপর মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের লালবাগ জোনাল টিমের পরিদর্শক মোহসীন উদ্দীন তাকে কারাগারে আটক আবেদন করেন। পরবর্তীতে আরেকটি আবেদনে তার দুই দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়।

ওই আবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা ও আসামি শিরীন শারমিন চৌধুরীসহ অন্য আসামিরা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে কুশীলব ছিলেন। তাদের সিদ্ধান্ত পরিকল্পনায় পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ নির্দেশে এই মামলার ঘটনা ঘটেছে মর্মে জানা যায়। পলাতক আসামিসহ মামলার ঘটনা সংক্রান্তে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনি কৌশলে প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যান। আসামিকে পুলিশ হেফাজতে এনে মামলার ঘটনা সংক্রান্তে নিবিড় ও ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করলে মামলার পলাতক আসামিদের অবস্থান নির্ণয় করাসহ গ্রেপ্তার এবং মামলার রহস্য উদঘাটনে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।
মামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচারের স্বার্থে পলাতক আসামিদের অবস্থান নির্ণয় করাসহ গ্রেপ্তার এবং মামলার রহস্য উদঘাটনে প্রয়োজনীয় সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহের জন্য শিরীন শারমিন চৌধুরীকে পুলিশি হেফাজতে নিবিড় ও ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুই দিনের পুলিশ রিমান্ড প্রয়োজন। বিকেল সোয়া ৩টার দিকে পুলিশি প্রহরায় তাকে আদালতের কাঠগড়ায় তোলা হয়। এ সময় অন্যান্য আসামির মতো তার মাথায় হেলমেট বা গায়ে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট দেখা যায়নি।

এরপর তার উপস্থিতিতে রিমান্ড শুনানি শুরু হয়। তিনি কাঠগড়ার সামনের লোহার রেলিং ধরে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে ছিলেন।
ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী রিমান্ডের পক্ষে শুনানি করেন। শুনানিতে তিনি বলেন, এই আসামি ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী। তিনি বিনা ভোটে নির্বাচিত এমপি ছিলেন। তিনি ফ্যাসিস্ট সরকারের একজন উপকারভোগী। এ মামলায় এজাহারনামীয় ৩ নম্বর আসামি। এতদিন আত্মগোপনে ছিলেন। পরে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। এ মামলার ঘটনার সাথে তার সম্পৃক্ত থাকার প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। এ ছাড়া এই ঘটনার সঙ্গে আর কারা জড়িত ও আলামত উদ্ধারের জন্য তাকে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। এ জন্য তার সর্বোচ্চ দুই দিনের রিমান্ড প্রার্থনা করছি।

এ সময় আসামিপক্ষের আইনজীবী ইবনুল কাওসার এবং এ বি এম হামিদুল মেজবাহ রিমান্ড বাতিল ও জামিন চেয়ে শুনানি করেন। শুনানিতে তারা বলেন, এ মামলায় ১৩০ জন আসামি যার মধ্যে শিরীন শারমিন ৩ নম্বর আসামি। মামলায় শুধু তার নামটাই রয়েছে। তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ নেই। ঘটনার ১০ মাস পর এ মামলা করা হয়েছে। সাংবিধানিকভাবে তিনি মহান সংসদের স্পিকার হওয়ায় তিনি ছিলেন নিউট্রাল একজন। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকেন্দ্রিক মামলা ছাড়া তার বিরুদ্ধে আর কোনো মামলা নেই। তিনি বিগত সরকারের আমলে কোনো অন্যায় বা লুট করেছেন এই মর্মে কোনো অভিযোগ নেই। তিনি ক্লিন ইমেজের একজন ব্যক্তি। দীর্ঘদিন পলাতক অবস্থায় থাকায় তিনি এখন অসুস্থ। তাকে রিমান্ডে নেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে বিকেল ৩টা ২৭ মিনিটে আদালত জামিন ও রিমান্ড উভয় নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

এ সময় আসামিপক্ষের এক আইনবীবী আদালতকে জানান, শিরীন শারমিন কথা বলতে চান। তবে আদালত কথা বলার কোনো অনুমতি দেননি। পরে পুলিশি প্রহরায় ৩টা ৩৫ মিনিটে আদালত থেকে বের করে হাজতখানায় নেওয়া হয়।

এর আগে সোমবার দিবাগত রাত আনুমানিক সাড়ে ৪টার দিকে রাজধানীর ধানমণ্ডির ৮/এ রোডের একটি বাসা থেকে তাকে আটক করা হয়। আটকের পর তাকে মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।

হত্যাচেষ্টা মামলার সূত্রে জানা গেছে, জুলাই আন্দোলন চলাকালে ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই লালবাগ থানার আজিমপুর সরকারি কলোনির ভেতরে মিছিল করছিলেন ভুক্তভোগী মো. আশরাফুল ওরফে ফাহিম। এ সময় আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার আদেশে ও বিপ্লব বড়ুয়া, ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামান খান কামালের পরিকল্পনা ও নির্দেশে পুলিশ ও আওয়ামী সন্ত্রাসীরা বৈষম্যবিরোধী শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারী নিরস্ত্র ছাত্র জনতার উপর দেশীয় ও বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করে হত্যাযজ্ঞ চালায়। এ সময় মো. আশরাফুল ওরফে ফাহিমের বাঁ চোখ ভেদ করে চোখের রেটিনার পিছনে একটি গুলিবিদ্ধ হয়। যা বিশেষজ্ঞ চিকিৎস বের করতে পারেননি। এ ছাড়া মাথায় দুটি, কপালে দুটি, মুখের ডান চিবুকে একটি ও ডান হাতের কনুইতে প্রায় ১২০-১৪০টি গুলি বিদ্ধ হন। এতে ভুক্তভোগী আশরাফুল ঘটনাস্থলেই ঢলে পড়েন। পরে আন্দোলনকারী কয়েকজন তাকে ধরে নিয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান এবং ভর্তি করে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতালে অপারেশন করেন এবং জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে রেফার করেন। সেখানে বাম চোখের অপারেশন করেন। আরো উন্নত চিকিৎসার জন্য সিএমএইচ এ যান, সেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা অপারেশন করে গুলি বের করেন। এ ঘটনায় ২০২৫ সালের ১৭ জুলাই লালবাগ থানায় ভুক্তভোগী আশরাফুল বাদী হয়ে হত্যাচেষ্টা মামলা করেন।

আইনিজীবীদের হট্টগোল, সাংবাদিকদের বের করে দিলেন বিচারক : সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর রিমান্ড শুনানিকে কেন্দ্র করে চরম বিশৃঙ্খলা ও হট্টগোলের ঘটনা ঘটেছে। এসময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়ে বিচারক সাংবাদিকদের ওপরই ক্ষোভ ঝাড়েন। মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানার আদালতে এ ঘটনা ঘটে। শুনানি শেষে আদালত রিমান্ড আবেদন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। আদেশ ঘোষণার পরপরই আসামিপক্ষের আইনজীবীরা এজলাসের ভেতর হট্টগোল শুরু করেন। পুরো পরিস্থিতিতে বিচারককে এজলাসে নির্লিপ্তভাবে বসে ছিলেন বলে অভিযোগ করেছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। একপর্যায়ে আইনজীবীদের নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ হয়ে বিচারক আদালতে পেশাগত দায়িত্ব পালনরত সাংবাদিকদের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেন। পরে তাদের এজলাস থেকে বের করে দেওয়া হয়। এ সময় পিপি ওমর ফারুক ফারুকী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন। কোনো সুস্পষ্ট কারণ ছাড়াই সাংবাদিকদের সঙ্গে এমন আচরণে আদালতে উপস্থিত আইনজীবী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে বিস্ময় ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। বিচারিক পরিবেশে এমন পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সংশ্লিষ্ট মহলে।

বাংলাদেশ সময়: ১৭:২০:৪৮   ১৪ বার পঠিত