
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও স্মারক যথাযথ সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকারের শপথ গ্রহণ স্থান (মুজিবনগর) পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে এ দাবি জানিয়েছে তারা। ওই দাবি বাস্তবায়নে পাঁচ দফা সুপারিশ উত্থাপন করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত সুপারিশে বলা হয়, অবিলম্বে মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্সসহ সারা দেশে মুক্তিযুদ্ধের ক্ষতিগ্রস্ত স্মারকসমূহ পুনর্নির্মাণ করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, স্মারক, গণকবর, বধ্যভূমিসহ স্মৃতিবিজড়িত স্থানসমূহ সংরক্ষণের যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের স্মারকসমূহে হামলাকারী দুর্বৃত্তদের অবিলম্বে গ্রেফতার ও বিচার করতে হবে। যথাযোগ্য মর্যাদায় রাষ্ট্রীয়ভাবে মুজিবনগর দিবস পালন করতে হবে।
মুজিবনগরে নির্মাণাধীন মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি জাদুঘরটির কাজ দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। পাশাপাশি সেখানে মুক্তিযুদ্ধ গবেষণাকেন্দ্র স্থাপন করতে হবে। দলমতের ঊর্ধ্বে নির্মোহভাবে রচিত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও বীরত্বগাঁথা পাঠ্যপুস্তকে স্থান দিতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাংবাদিক আবু সাইদ খান বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালে ছদ্মবেশী কিছু দুর্বৃত্ত মুজিবনগর কমপ্লেক্স ভাঙচুর করেছে, বেশকিছু ভাস্কর্য ভেঙে ফেলেছে।
এ সব ছদ্মবেশী দুর্বৃত্তরা গণ-অভ্যুত্থানের আগে ও পরে মব সৃষ্টি করে দেশের নানা স্থানে মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ধ্বংস করেছে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, অন্তর্বর্তী সরকার নির্লিপ্ত থেকেছিল, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও স্মারক রক্ষায় কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। হামলকারীদের বিরুদ্ধে কোনো আইনানুগ ব্যবস্থাও গ্রহণ করেনি।’
তিনি বলেন, ‘এবার দিবসটিতে সরকারিভাবে কোনো কর্মসূচি নেই। সরকারের কোনো মন্ত্রী বা কর্মকর্তা শ্রদ্ধাঞ্জলিও অর্পণ করেননি।
আমরা দেখলাম, কেবলমাত্র স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও কয়েকটি বাম সংগঠন শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করেছে। এ ব্যাপারে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী বাংলাদেশ সরকারের শপথ দিবসে সরকারের এ নিঃস্পৃহতা আমাদের হতবাক ও ব্যথিত করেছে।’
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, ‘ছোট-বড় মিলে ৩০০ ভাস্কর্য ভেঙে ফেলা হয়েছে। জাতীয় চার নেতার ভাস্কর্য, অপারেশন সার্চলাইটের ঘটনা চিত্র, স্বাক্ষর স্থানসহ প্রায় সব স্থাপনা আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। শুধু তাই নয়, সারা দেশে থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছি মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন স্থাপনায় আক্রমণ হচ্ছে। এর পিছনে রয়েছে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি যারা মুক্তিযুদ্ধকে ভুলিয়ে দিতে চায়। আমরা জেনেছি এসব স্থানে হামলা হওয়ার পর কোনো মামলা নেওয়া হয়নি।’
বাসদের সহ-সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ যাদের গাত্রদাহের কারণ তারা ইতিহাসকে ভুলন্ঠিত ও ধ্বংস করতে চায়। যারা আমাদের গৌরবের ইতিহাস ধ্বংস করতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে গণ-প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের শপথ গ্রহণ বা মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র সংগ্রাম কোন একটি ঘটনার প্রেক্ষিতে ঘটেনি বরং অনেকগুলো ঘটনার প্রেক্ষিতে মুক্তিযুদ্ধ একটি সাংগঠনিক রূপ নিয়েছিল। মুজিবনগর গোটা জাতির সম্পদ, গোটা জাতির অহংকার। এ স্মৃতি ধ্বংসকারীদের বিরুদ্ধে সবাইকে রুখে দাড়াতে হবে।’
নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন বলেন, ‘মুজিবনগর এলাকাটি ঐতিহাসিক বিভিন্ন ঘটনাবলির সাক্ষী। এটি আমাদের দেশের প্রথম রাজধানী। এটিকে সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ আমাদের নৈতিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। স্বাধীনতার মুল ইতিহাসকে একটি পূর্ণাঙ্গ রূপ ও নতুন প্রজন্মকে জানানোর জন্য মুজিবনগরে একটি মুক্তিযুদ্ধ কমপ্লেক্স তৈরির বা রুপান্তরের জোর দাবি জানাচ্ছি।’
এ সময় এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মিনহাজুল হক চৌধুরী, মানবাধিকার কর্মী দীপায়ন খীসা, দোলন চন্দ্র রায় ও রফিক আহমেদ সিরাজী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশ সময়: ১৫:৫৩:২০ ৫ বার পঠিত