মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

অনলাইন জুয়া নিয়ন্ত্রণে ‘জুয়া প্রতিরোধ বিল-২০২৬’ সংসদে উত্থাপন

প্রথম পাতা » ছবি গ্যালারী » অনলাইন জুয়া নিয়ন্ত্রণে ‘জুয়া প্রতিরোধ বিল-২০২৬’ সংসদে উত্থাপন
মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬



অনলাইন জুয়া নিয়ন্ত্রণে ‘জুয়া প্রতিরোধ বিল-২০২৬’ সংসদে উত্থাপন

অনলাইন জুয়া, ডিজিটাল বেটিং প্ল্যাটফর্ম এবং ম্যাচ ফিক্সিংয়ের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে ‘জুয়া প্রতিরোধ বিল, ২০২৬’ আজ জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে। বিলটিতে জুয়া-সংক্রান্ত বিভিন্ন অপরাধের জন্য কারাদ- ও আর্থিক জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

সভাপতিমণ্ডলির সদস্য জয়নুল আবেদীনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন।

বিলটি উত্থাপনকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর জুয়া কার্যক্রমের দ্রুত বিস্তার মোকাবিলায় নতুন আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছে। বর্তমানে স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং অনলাইন পেমেন্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে জুয়া কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ায় প্রচলিত আইন দিয়ে এসব নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

তিনি বলেন, ঔপনিবেশিক আমলের ‘পাবলিক গ্যাম্বলিং অ্যাক্ট, ১৮৬৭’ আধুনিক বাস্তবতায় আর কার্যকর নয়। তাই বিদ্যমান আইনকে যুগোপযোগী ও আধুনিক করার লক্ষ্যে নতুন বিলটি প্রণয়ন করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত আইনে ডিজিটাল জুয়া প্ল্যাটফর্ম, অনলাইন ও দূরবর্তী জুয়া, বেটিং ও ওয়েজারিং, ডিজিটাল সম্পদ ও ওয়ালেট, টোটালাইজেটর, পেশাদার বুকমেকার, ম্যাচ ফিক্সিং এবং স্পট ফিক্সিংয়ের মতো নতুন ধারণাগুলোর আইনি সংজ্ঞা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

সরকারের মতে, প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ফলে জুয়ার ধরন ও পরিসর ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে, যা জনশৃঙ্খলা, সামাজিক স্থিতিশীলতা, মানসিক স্বাস্থ্য এবং আর্থিক নিরাপত্তার জন্য নতুন ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সাইবার অপরাধ তদন্তকারীরা দীর্ঘদিন ধরে বিদেশভিত্তিক ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন মেসেজিং অ্যাপের মাধ্যমে পরিচালিত অনলাইন বেটিং নেটওয়ার্কের বিস্তার নিয়ে সতর্ক করে আসছেন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক জুয়া প্ল্যাটফর্মে স্থানীয় ব্যবহারকারী যুক্ত করার অভিযোগে বিভিন্ন অবৈধ বেটিং চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেছে কর্তৃপক্ষ। তদন্তে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ও ডিজিটাল পেমেন্ট চ্যানেল ব্যবহারের তথ্যও পাওয়া গেছে।

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিকাংশ অনলাইন জুয়া অপারেটর সীমান্ত পেরিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করে, ফলে বিদ্যমান আইনি কাঠামোর আওতায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

এ প্রেক্ষাপটে প্রস্তাবিত আইনে শুধু জুয়া খেলা নয়, বরং অবৈধ জুয়া আয়োজন, পরিচালনা, প্রচার, সহায়তা প্রদান কিংবা প্রযুক্তিগত সহযোগিতাকেও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেট টুর্নামেন্ট, ফুটবল লিগ ও ই-স্পোর্টস প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে তরুণদের মধ্যে অনলাইন বেটিংয়ের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত জুয়া আর্থিক সংকট, পারিবারিক বিরোধ, উদ্বেগ ও অন্যান্য মানসিক সমস্যার কারণ হতে পারে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ব্যক্তিগতভাবে জুয়া খেলার কারণে আসক্তি শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়ে।

খসড়া আইনে ম্যাচ ফিক্সিং ও স্পট ফিক্সিংকে পৃথকভাবে সংজ্ঞায়িত করে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ক্রীড়া বিশেষজ্ঞদের মতে, অবৈধ বেটিং বাজার প্রতিযোগিতার ফলাফল প্রভাবিত করার সুযোগ তৈরি করে এবং খেলাধুলার প্রতি জনআস্থা ক্ষুণ্ন করে।

খসড়া অনুযায়ী, অপরাধের ধরন ও মাত্রা অনুযায়ী দোষীদের জরিমানা, কারাদ- অথবা উভয় দ-ে দ-িত করা যাবে। আইন প্রণয়নের পর্যালোচনা প্রক্রিয়ায় শাস্তির বিস্তারিত কাঠামো চূড়ান্ত করা হবে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী বলেন, ‘অনলাইন জুয়া এখন আর কেবল সামাজিক সমস্যা নয়, এটি সাইবার নিরাপত্তা ও আর্থিক অপরাধেরও বড় উদ্বেগের বিষয়। অনেক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারকারীদের সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহ করে এবং অর্থপাচারের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। তাই আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়। অনলাইন জুয়া নেটওয়ার্ক মোকাবিলায় আর্থিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা, টেলিযোগাযোগ কর্তৃপক্ষ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

অবৈধ জুয়া ওয়েবসাইট বন্ধ করা, সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেন পর্যবেক্ষণ, ডিজিটাল সাক্ষরতা বৃদ্ধি এবং জনসচেতনতা গড়ে তোলার মতো পদক্ষেপও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তারা মনে করেন।

বিলটি আইনে পরিণত হলে এক শতাব্দীরও বেশি সময় পর বাংলাদেশের জুয়া-সংক্রান্ত আইনি কাঠামোয় বড় ধরনের সংস্কার ঘটবে, যা ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল জুয়া ব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারের প্রচেষ্টার প্রতিফলন হবে।

বিলটি উত্থাপনের পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিতে তা পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য প্রেরণ এবং আগামী পাঁচ দিনের মধ্যে সংসদে প্রতিবেদন দাখিলের প্রস্তাব করেন। পরে সর্বসম্মতিক্রমে তা গৃহীত হয়।

বাংলাদেশ সময়: ২৩:২৫:৫৪   ১১ বার পঠিত