
দেশের স্বাধীনতার ৫৫ বছর পেরিয়ে গেলেও শহীদ ও জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক তালিকা কেন হয়নি, সে প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, ‘মুক্তিযোদ্ধাদের (জীবিত) যেটা (তালিকা) আছে, সঠিক হোক বেঠিক হোক, কিছুটা আছে। শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের কোনো তালিকা নাই। ৬৫৬ জন নাকি ভাতা পায়, আমি শুনেছি।’
শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে জামায়াতের আমির বলেন, ‘আমরা বলছি, এত লক্ষ, এত লক্ষ, তাইলে এত লক্ষটা রেকর্ড হচ্ছে না কেন? এটা তো সরকারের দায়িত্ব। এতগুলা সরকার এল-গেল, সবাই দাবি করেন যে আমরা মুক্তিযুদ্ধের স্টেকহোল্ডার। …এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটা করছেন না কেন? এটা করেন। ইতিহাসটা উঠে আসুক। ওই ফ্যামিলিগুলা গ্লোরিফাই হোক। শহীদের আত্মা শান্তি পাক।’
আজ মঙ্গলবার রাজধানীর সিরডাপ আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ‘আজাদী সংগ্রামের পটভূমিতে জুলাই বিপ্লব ২০২৪’ শিরোনামের বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে শফিকুর রহমান এ কথা বলেন। ‘জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে মোড়ক উন্মোচন’ শীর্ষক এ অনুষ্ঠানের অনুষ্ঠানের আয়োজক ওয়ান ইনিশিয়েটিভ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ওআইআরডি)।
সরকারকে ২০২৪ সালের জুলাই গণ–অভ্যুত্থান নিয়ে সঠিক ইতিহাস রচনার উদ্যোগ নিতে এই অনুষ্ঠানে আহ্বান জানান বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি বলেন, এ বিষয়ে আশাবাদী হওয়া যাচ্ছে না। কারণ, গণ–অভ্যুত্থানের আগে রাজনীতিবিদদের কণ্ঠে যে সুর ছিল, ৫ আগস্টের পর থেকে আস্তে আস্তে সে সুর পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর আরও ব্যাপকভাবে বদলে গেছে। আগে যেসব অঙ্গীকার করেছিল, এখন অনেকে সেটি বেমালুম ভুলে গেছে। তার বিপরীত ন্যারেটিভ ও বয়ান তৈরি করা হচ্ছে।
জনগণের অভিপ্রায়ের আলোকে গণভোট হলেও সরকার এখন তা মানতে চাইছে না বলে মন্তব্য করেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, তবে এই রায় তাদের (সরকার) অবশ্যই মানতে হবে। জনগণ গণভোটে যে রায় দিয়েছে, সেটি বাস্তবায়ন করতে হবে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে হত্যা ও হামলার বিচারে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গতি থাকলেও বর্তমান সরকারের সময়ে ধীরগতি দেখা যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন জামায়াতের আমির। তিনি বলেন, জুলাই স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধনের কোনো আলামত দেখা যাচ্ছে না। জুলাইকে ভুলিয়ে দেওয়ার নিরন্তর সংগ্রাম শুরু হয়েছে। দেশবাসীকে সঙ্গে নিয়ে এসব পরিকল্পনা তছনছ করে দেওয়া হবে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ভুলিয়ে দেওয়ার জন্য অনেক প্রস্তাব ও প্রলোভন দেখানো হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন শফিকুর রহমান। সরকার যেন জুলাই যোদ্ধাদের গায়ে হাত না দেয়, সে আহ্বান জানান বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি বলেন, যে জুলাই যোদ্ধাদের কারণে তারা (বিএনপি) সরকারে যেতে পেরেছে, সেই যোদ্ধাদের চোখ যেন কেড়ে না নেওয়া হয়। হাত-পা যেন না ভাঙে, রক্ত যেন না ঝরায়। এটি করলে সেটি চরম নিমকহারামি হবে।
দেশের স্বার্থে যেকোনো বিষয়ে জামায়াত ঐক্যবদ্ধ হতে রাজি আছে বলে উল্লেখ করেন দলটির আমির। তিনি বলেন, তবে জনগণের একটি অধিকারও বিসর্জন দিয়ে সেটি হবে না। তাঁরা কোনো আধিপত্যবাদের কাছে মাথা নত করবেন না।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান বলেন, অতীতের ফ্যাসিবাদী শাসনের মতো দেশ পরিচালনার চিন্তা করলে তাদের মতো বর্তমান সরকারকেও বিদায় নিতে হবে। ফ্যাসিবাদের দোসরদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ ফারহান ফাইয়াজের বাবা শহীদুল ইসলাম বলেন, জুলাই বিপ্লবের বিরুদ্ধে চক্রান্ত শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।
‘আজাদী সংগ্রামের পটভূমিতে জুলাই বিপ্লব ২০২৪’ বইয়ের অন্যতম লেখক ও ইউনিভার্সিটি টিচার্স লিংকের (ইউটিএল) সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যাপক মোহাম্মদ বিলাল হোসাইন বলেন, জুলাই বিপ্লবকে লিখিত আকারে ধারণ করার জন্য শিক্ষাবিদদের মধ্যে জড়তা আছে। একাডেমিক ও সাংস্কৃতিক জায়গায় ধারণ করতে না পারলে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানকে টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে। যথাযথ ইতিহাস লেখা না গেলে অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে বিলম্ব হবে। এ জন্য তিনি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সঠিক ইতিহাস চর্চা করার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আইআরডির উপদেষ্টা ও বুয়েটের অধ্যাপক মো. ফখরুল ইসলাম। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম। বক্তব্য দেন মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান, জামায়াতের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল, ডাকসুর ভিপি মো. আবু সাদিক (সাদিক কায়েম), শিবিরের সাবেক সভাপতি মনজুরুল ইসলাম, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. শহিদুল ইসলাম প্রমুখ।
বাংলাদেশ সময়: ১৬:২৫:৪৯ ১ বার পঠিত