মধুখালীতে কিশোরীর মৃত্যু, মৃত্যুর আগে ভিডিওতে চারজনের নাম প্রকাশ

প্রথম পাতা » ছবি গ্যালারী » মধুখালীতে কিশোরীর মৃত্যু, মৃত্যুর আগে ভিডিওতে চারজনের নাম প্রকাশ
মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬



মধুখালীতে কিশোরীর মৃত্যু, মৃত্যুর আগে ভিডিওতে চারজনের নাম প্রকাশ

সদরপুর ফরিদপুর প্রতিনিধি : ফরিদপুরের মধুখালীতে স্কুলে যাওয়ার পথে এক কিশোরীকে তুলে নিয়ে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। লোকলজ্জার ভয়ে ওই কিশোরী হারপিক পান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। ঘটনার প্রায় দেড় মাস পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় নিজ বাড়িতে তার মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর আগে ধারণ করা একটি ভিডিওতে ঘটনার বর্ণনা দিয়ে অভিযুক্তদের নাম প্রকাশ করে গেছে সে। ভিডিওটি ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে পরিবারের অভিযোগ, থানায় গিয়েও তারা মামলা করতে পারেননি।

নিহত মিথিলা আক্তার ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার আড়পাড়া ইউনিয়নের রাজধরপুর গ্রামের আ. হান্নান খানের মেয়ে। সে আড়পাড়া কাজী সিরাজুল ইসলাম স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। গত ২৬ অক্টোবর দিবাগত রাত ১টার দিকে নিজ বাড়িতে তার মৃত্যু হয়।

১৭ বছর বয়সী মিথিলা আক্তারের পারিবারিক সিদ্ধান্তে আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ের কাবিনও সম্পন্ন হয়েছিল। পরিবারের অভিযোগ, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সোমবার স্কুলে যাওয়ার পথে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের রাজধরপুর এলাকায় চার যুবক তাকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায়। পরে নির্জন গড়াই নদীর তীরের মাটিকাটা এলাকায় তাকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করা হয়। এমন নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে সে তাৎক্ষণিকভাবে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। প্রায় দেড় মাস মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে শেষ পর্যন্ত হার মানে মিথিলা।

মেয়ের এমন মৃত্যুতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন বাবা হান্নান শেখ। অসুস্থ মা জেসমিন খাতুনও শয্যাশায়ী।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সোমবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে স্কুলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হয় মিথিলা। স্কুলে যাওয়ার পথে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে পৌঁছালে মোটরসাইকেলে এসে তাকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায় পাশের মাগুরা জেলার নাকোল গ্রামের রাফি শেখ (২১), রায়নগর গ্রামের রাহুল শেখ (২০) ও সায়মন বিশ্বাস (২০)। পরিবারের সদস্যরা খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে গেলেও তাকে খুঁজে পাননি।

পরিবারের অভিযোগ, পরে মাগুরার শ্রীপুর থানাধীন নাকোল গ্রামের গড়াই নদীর নির্জন মাটিকাটা ঘাট এলাকায় নিয়ে ওই তিন যুবক মিথিলাকে ধর্ষণ করে। সোহাগ শেখ (২০) নামের আরেক যুবক এতে সহযোগিতা করে। একপর্যায়ে তাদের হাত থেকে ছুটে গিয়ে মধুমতি নদীতে ঝাঁপ দেয় মিথিলা।

এ সময় স্থানীয় বাসিন্দারা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে পুলিশকে খবর দেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মিথিলাকে উদ্ধার করে নাকোল পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে যায়। খবর পেয়ে পরিবারের সদস্যরাও সেখানে ছুটে যান। পরে অভিমানে পুলিশ ফাঁড়ির বাথরুমে গিয়ে সেখানে থাকা বিষাক্ত হারপিক পান করে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে কিশোরী।

তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশের সহযোগিতায় তাকে মাগুরা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরদিন উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয় ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে ১১ দিন চিকিৎসা শেষে পরিবারের সদস্যরা তাকে বাড়িতে নিয়ে আসেন। এরপর থেকে শারীরিক নানা জটিলতা নিয়ে বাড়িতেই তার চিকিৎসা চলছিল। একপর্যায়ে তার শরীর কঙ্কালসার হয়ে পড়ে। গত ২৬ অক্টোবর দিবাগত রাত ১টার দিকে নিজ বাড়িতে মারা যায় মিথিলা।

খবর পেয়ে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। পরে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

এ ঘটনায় থানায় গিয়েও মামলা করতে না পারার অভিযোগ করেছে পরিবার। এদিকে মৃত্যুর আগে ধারণ করা একটি ভিডিওতে ঘটনার বিবরণ দিয়ে গেছে মিথিলা। ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে তাকে বলতে শোনা যায়, সোহাগ শেখ, রাফি শেখ, রাহুল শেখ ও সায়মন বিশ্বাস তাকে মোটরসাইকেলে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায়।

গতকাল রবিবার (১ নভেম্বর) বিকেলে সরেজমিনে মিথিলাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, শোকে স্তব্ধ হয়ে আছে পুরো পরিবার। মেয়ের মৃত্যুতে বাকরুদ্ধ বাবা হান্নান শেখ। অসুস্থ মা জেসমিন খাতুনও শয্যাশায়ী। প্রতিবেশীরা পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দিতে বাড়িতে ভিড় করছেন।

কোথাও বিচার না পেয়ে সাংবাদিকদের সামনে ক্ষোভ প্রকাশ করেন মিথিলার মা জেসমিন খাতুন। তিনি বলেন, ‘আমরা কম ঘুরি নাই। একটা সন্তান যহন হারায় যায় তারা কি বইস্যা থাহে? কিন্তু এই পুলিশ-দারোগা, যারা অপরাধী তাঁগের (তাঁদের) শাস্তি দেয় না, দুই থানাতে কেস নিলো না ক্যাম্মায়ে (কেমনে)? কেস নেবে না কেন বলেন? আপনি যে অপরাধী, আপনার শাস্তি নাই? যার মৃত্যু অয়ে গ্যাছে—কেস (মামলা) না নিয়ে তাগের বাড়ি পাঠায় দেয় ক্যাম্মায়ে?’

মিথিলার মা জেসমিন খাতুনের ভাষ্যমতে, ঘটনার পর মধুখালী থানা-পুলিশ পরিবারের সদস্যদের থানায় ডেকে নেয়। পরে তাদের শ্রীপুর থানায় পাঠানো হয়। সেখানে মামলা না নিয়ে জোরপূর্বক একটি সাদা কাগজে স্বাক্ষর রেখে তাদের বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

তিনি বলেন, ‘শ্রীপুর থানায় গেলে ওসি মেলা লিখিত নেয় এবং একটা কাগজে সই রাইখ্যা দেয়। আর ওসি বলল, কেস ময়নাতদন্তের পর অবে, এহন অবিনা (হবে না)। মনে অচ্ছে উনি (ওসি) প্রাইভেট পড়াচ্ছে। তখন থানায় সোহাগ ও রাফির পরিবারের লোকজনও ছিল। পরে মামলা না নিয়ে আমাদের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। এরপর থেকে কোনো থানায়ই মামলা নিচ্ছে না। আমার মাইয়্যাডাকে এভাবে মাইর্যা ফেলছে, বিচারডা কি কোথাও পাব না।’

মিথিলার ভগ্নিপতি বিপ্লব শেখ অভিযোগ করে বলেন, ‘আমার শ্যালিকাকে তুলে নেওয়ার তিন মাস আগে অন্য জায়গায় কাবিন হয়েছিল। এতে ওর মামাতো ভাই ক্ষিপ্ত হয়, কারণ সে বিয়ে করতে চেয়েছিল। এরপর পরিকল্পনা অনুযায়ী রাফির সঙ্গে যোগাযোগ করে এই ঘটনা ঘটায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘মিথিলা সুস্থ হওয়ার পর ঘটনাটি আমাদের জানিয়েছিল। এরপর ওর ভবিষ্যতের স্বার্থে বা নতুন বিয়ে হওয়ায় আমরাও কোথাও জানাইনি। কিন্তু মিথিলা এসব মেনে নিতে না পেরে শেষ পর্যন্ত চলে গেল। আমরা এই চারজনের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।’

মিথিলার বাবা হান্নান শেখ বলেন, ‘সরকারের কাছে দাবি, আমার মেয়ের মৃত্যুর জন্য যারা দায়ী, তাদের বিরুদ্ধে মামলা নেওয়া হোক। আমার মেয়ের হত্যাকারীদের বিচার চাই।’

ঘটনার বিষয়ে পুলিশের বক্তব্য:

শ্রীপুর থানা-পুলিশের দাবি, রাফি শেখের সঙ্গে মিথিলার প্রেমের সম্পর্ক ছিল। এর মধ্যে মিথিলার অন্যত্র বিয়ে হয়। এর জের ধরে ১৪ সেপ্টেম্বর মধুমতি নদীর মাটিকাটা ঘাট এলাকায় দুজন দীর্ঘ সময় গল্প করে এবং নদীতে ঝাঁপ দেয়। ঘাটে থাকা রফিকুল মাঝি বিষয়টি দেখতে পেয়ে স্থানীয়দের জানান। পরে স্থানীয় পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা মিথিলাকে উদ্ধার করে নিয়ে যান। একপর্যায়ে ফাঁড়ির বাথরুমে গিয়ে সে হারপিক পান করে।

শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ওলি মিয়া বলেন, এ ঘটনায় তাঁরা একটি তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করেছেন। তদন্তে ওই ঘাট এলাকায় ধর্ষণের শিকার হওয়ার কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। কারণ, ঘাটটির আশপাশে কোনো ঝোপঝাড় নেই এবং এলাকাটি ফাঁকা। তা ছাড়া সেখানে মানুষের যাতায়াত রয়েছে এবং সার্বক্ষণিক মাঝি থাকেন। তাঁদের কেউ এ ধরনের কোনো দৃশ্য দেখেননি। তবে অন্য কোথাও ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে কি না, তা তাঁর জানা নেই।

তিনি আরও বলেন, ‘মেয়েটিকে যখন উদ্ধার করা হয়, তখন ধর্ষণের কথা জানায়নি। এমনকি দেড় মাসেও কেউ জানায়নি। তার মৃত্যুর পর একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে পরিবার, যা রহস্যজনক। খবর পেয়ে তার পরিবারের সদস্যরা ফাঁড়িতে আসলে অভিভাবকদের জিম্মায় দেওয়া হয়। এ সময় ফাঁড়ির বাথরুমে গিয়ে হারপিক খায় কিশোরী। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। তবে ধর্ষণের বিষয়টি পুলিশকে জানায়নি ওই কিশোরী।’

তিনি আরও জানান, যেহেতু চিকিৎসাধীন অবস্থায় মধুখালীর নিজ বাড়িতে কিশোরীর মৃত্যু হয়েছে, সে কারণে মধুখালী থানা এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে।

এ বিষয়ে মধুখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুকদেব রায় বলেন, ঘটনাটি জানার পর তিনি শ্রীপুর থানায় যোগাযোগ করেন। শ্রীপুর থানার ওসি পরিবারকে সেখানে পাঠিয়ে দিতে বলেন। এরপর পরিবারের সদস্যরা শ্রীপুর থানায় গেলে একটি অপমৃত্যুর মামলা নেওয়া হয়। পরবর্তীতে তিনি জানতে পারেন, মেয়েটি ধর্ষণের শিকার হয়েছিল। তবে দেড় মাস আগের ঘটনাটি তাঁদের কেউ জানাননি।

তিনি আরও জানান, ২ নভেম্বর ২০২৬, সোমবার মিথিলার বাবা আ. হান্নান খান চারজনকে আসামি করে একটি অভিযোগ দায়ের করেছেন। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বাংলাদেশ সময়: ১৭:৫২:২২   ২০ বার পঠিত   #  #  #  #







ছবি গ্যালারী’র আরও খবর


ফতুল্লায় ২০০ পিস ইয়াবাসহ ৪২ বছর বয়সী ব্যক্তি গ্রেফতার
মধুখালীতে কিশোরীর মৃত্যু, মৃত্যুর আগে ভিডিওতে চারজনের নাম প্রকাশ
আলিবাবার ভেরিফায়েড সাপ্লায়ার হলো রিমার্ক, যুক্ত হচ্ছে ১ হাজারের বেশি পণ্য
পোশাক খাতে অস্থিরতা সৃষ্টিকারীদের প্রকৃত শ্রমিক মনে করে না সরকার: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
শ্রমিক আন্দোলনে নাশকতায় আওয়ামী লীগের অর্থ খরচের সংযোগ থাকতে পারে : তথ্য উপদেষ্টা
সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেন মির্জা ফয়সল আমীন ও এলিজা জামান
রাষ্ট্রপতির কাছে জাপান সফরের অভিজ্ঞতা জানালেন প্রধানমন্ত্রী
স্পীকারের সাথে বাংলাদেশ ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ইউরোপিয়ান পার্টনার ফর ডেমোক্রেসি এর প্রতিনিধিদলের সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত
জামিনে মুক্ত হয়ে বাড়ি ফেরা হলো না, বিস্ফোরক মামলায় ভাঙ্গায় বাস থেকে র‍্যাবের হাতে গ্রেপ্তার ৮ আসামি
বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের জনবল-সংক্রান্ত বিষয়াদি নিয়ে গঠিত কমিটির দ্বিতীয় সভা অনুষ্ঠিত

News 2 Narayanganj News Archive

আর্কাইভ