![]()
বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্দার লুকাশেঙ্কো বলেছেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র পরাজিত হয়েছে। রাশিয়া টুডে নেটওয়ার্ককে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ মন্তব্য করেন।
রাশিয়া টুডেকে দেয়া লুকাশেঙ্কোর সাক্ষাৎকারটি গত সোমবার (২০ এপ্রিল) প্রচারিত হয়। এতে বেলারুশের প্রেসিডেন্ট যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে একনায়কতন্ত্রের সঙ্গে তুলনা করেন। তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে সংঘাত মানেই ওয়াশিংটনের পরাজয়।
তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘একনায়কতন্ত্র সব সময়ই কোনো না কোনো ধরনের পরাজয় ও পতনের দিকে নিয়ে যায়। যেমনটা যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে ইরানের সঙ্গে হয়েছে। এখন হয়তো পুরো পতন হয়নি, কিন্তু এক ধরনের পরাজয় ঘটেছে।’
যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা কেন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেয়নি—এ বিষয়ে লুকাশেঙ্কো বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটো থেকে দূরত্ব বজায় রেখেছিলেন এবং মূলত নিজের দেশের স্বার্থ নিয়েই ভাবছিলেন।
লুকাশেঙ্কো বলেন, ট্রাম্প ইউরোপীয় ইউনিয়নকে দেখিয়ে দিয়েছেন যে, তাদের সমস্যা তাদের নিজেদেরই, এর সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক নেই। তিনি ইউরোপ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এমনকি ন্যাটো থেকেও নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন এবং কেবল আমেরিকার সমস্যাকেই গুরুত্ব দিয়েছেন।
‘সুপারপাওয়ার, কিন্তু সুপার ফোর্স নয়’
সাক্ষাৎকারে সাংবাদিক তাকে রূপকভাবে ‘সারা বিশ্বের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আন্দোলনের একজন নেতা’ হিসেবে উল্লেখ করেন। কারণ লুকাশেঙ্কোর নেতৃত্বে বেলারুশ শান্তিপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে এবং সব ধরনের সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষে অবস্থান নেয়।
এ সময় তাকে প্রশ্ন করা হয়—ভবিষ্যতে কি এমন সময় আসতে পারে, যখন সব দেশ একে অপরের বিরুদ্ধে না গিয়ে একসঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তুলবে?
জবাবে তিনি বলেন, ‘আল্লাহ চাইলে এমন সময় আসবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি দেখে আমার বিশ্বাস করা কঠিন যে খুব শিগগিরই এমন সময় আসবে।’
এই প্রসঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘কিছু ভুল সিদ্ধান্ত ও আবেগপ্রবণ আচরণ থাকা সত্ত্বেও ট্রাম্প এই শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যৎ আসার ক্ষেত্রে অনেক অবদান রেখেছেন। তিনি বিশ্বকে দেখিয়েছেন যে যুক্তরাষ্ট্র সর্বশক্তিমান নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘শক্তির দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র একটি সুপারপাওয়ার তথা পরাশক্তি, কিন্তু ‘সুপার ফোর্স’ নয়।’ লুকাশেঙ্কোর মতে, মধ্যপ্রাচ্যের ঘটনাবলি—বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে নেয়া ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ—এই কথার সত্যতা প্রমাণ করে।
‘একনায়কতন্ত্র’ ও ‘গণতন্ত্র’র তুলনা
সাক্ষাৎকারে রাশিয়া টুডের সাংবাদিক বলেন, পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গিতে বেলারুশকে একনায়কতন্ত্র বলা হয়, আর যুক্তরাষ্ট্রকে গণতন্ত্রের মডেল হিসেবে দেখানো হয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি চার বছর পর নতুন মানুষ ক্ষমতায় এলেও দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তেমন পরিবর্তন দেখা যায় না। অন্যদিকে বেলারুশে গত ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে ধারাবাহিক উন্নয়ন হয়েছে এবং রাষ্ট্রপ্রধান জনগণের সমর্থন পান।
এই প্রেক্ষাপটে সাংবাদিক প্রশ্ন করেন—আসলেই কি যুক্তরাষ্ট্রে গণতন্ত্র আছে, আর বেলারুশে একনায়কতন্ত্র? জবাবে বেলারুশের প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘তোমরা গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের কথা বলো—এসব শুধু কথার কথা। ভেনেজুয়েলায় তোমাদের নীতি, কিউবাকে হুমকি, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ—এসবই প্রমাণ করে তোমরাই আসল একনায়ক। তোমরা গণতান্ত্রিক নও।’
একটি উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরানে হামলার প্রথম দিনেই একটি মেয়েদের স্কুলে বোমা পড়ে, যেখানে প্রায় ২০০ মানুষ—মূলত শিশু—নিহত হয়।
তিনি বলেন, ‘তোমরা একটি স্বাধীন দেশের স্কুলে বোমা মেরেছ, যে দেশ তোমাদের জন্য কোনো হুমকি ছিল না। সেখানে শিশু ও শিক্ষক মারা গেছে—প্রায় ২০০ জন। আর গাজায় ইসরাইলের হামলায় কত মানুষ মারা গেছে, সেটাও দেখো। তাহলে মানবাধিকারের কথা কীভাবে বলো?’
লুকাশেঙ্কো বলেন, এই ধরনের নীতি মানুষের সবচেয়ে মৌলিক অধিকার—বেঁচে থাকার অধিকার—এর বিরুদ্ধে যায়। ‘মানবাধিকারের কথা বললে আগে মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। মানুষ বাঁচতে চেয়েছিল, বিশেষ করে শিশুরা। কিন্তু তোমরা তাদের ধ্বংস করেছ,’ তিনি বলেন।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নীতি গণতন্ত্র বা মানবাধিকারের জন্য নয়, বরং নিজেদের স্বার্থের জন্য। ইরানের ক্ষেত্রে সেই স্বার্থ হলো তেল ও গ্যাসের নিয়ন্ত্রণ নেয়া। ‘এই স্বার্থ পূরণে তোমরা যেকোনো কিছু করতে প্রস্তুত—যুদ্ধও। মানবাধিকারের তোয়াক্কা না করে বোমা মারো, ধ্বংস করো—এটাই একনায়কতন্ত্রের লক্ষণ,’ তিনি বলেন।
লুকাশেঙ্কো মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও প্রকৃত গণতন্ত্র নেই। ‘তোমরা গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের কথা বলো, কিন্তু দেশে কিছুই বদলায় না। তাহলে কি তোমাদের দেশেও একনায়কতন্ত্র আছে?’প্রশ্ন তার।
সবশেষে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে বেলারুশ থেকে গণতন্ত্র শিখতে পারে। ‘আমাদের দেশে তোমাদের চেয়ে অনেক বেশি গণতন্ত্র আছে—প্রকৃত গণতন্ত্র, প্রকৃত মানবাধিকার। মানুষকে হত্যা করলে মানবাধিকারের কথা বলার অধিকার থাকে না,’ বলেন তিনি।
বাংলাদেশ সময়: ১৫:৫৮:৩৯ ১১ বার পঠিত