
আলফাডাঙ্গা (ফরিদপুর) প্রতিনিধি : দুঃসময়ের মেঘ কেটে যখন এক চিলতে রোদ্দুর উঁকি দেয়, তখন বদলে যায় পুরো জীবনের রং। তেমনই এক রোদেলা সকাল উপহার দিল আলফাডাঙ্গা উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর। খামারিদের স্বাবলম্বী করার প্রত্যয়ে আর গ্রামীণ অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখতে অনুষ্ঠিত হলো এক হৃদয়ছোঁয়া খাদ্য বিতরণ কর্মসূচি। হাঁস, ছাগল ও ভেড়ার খাদ্য হাতে পেয়ে ১৯২ জন খামারির মুখে যে হাসি ফুটল, তা যেন কোনো দামি উপহারের চেয়েও মূল্যবান।
মঙ্গলবার। ( ৫ মে ২০২৬) দুপুরে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের সবুজ প্রাঙ্গণ পরিণত হয়েছিল এক উৎসবের আঙিনায়। খাদ্যের বস্তা নয়, যেন স্বপ্নের বোঝা কাঁধে নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন খামারিরা। তাঁদের চোখেমুখে ছিল কৃতজ্ঞতার দীপ্তি, বুকের ভেতর ছিল নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ফরিদপুর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা.একেএম আসজাদ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) একেএম রায়হানুর রহমান এবং উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা তরুণ বসু। সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. ভবেন বাইন, যাঁর আন্তরিকতায় আয়োজনটি পেয়েছিল এক ভিন্ন মাত্রা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, মোট ১৯২ জন সুফলভোগীর মাঝে খাদ্য বিতরণ করা হয়। এর মধ্যে ৬৫ জন হাঁস খামারি পেয়েছেন জনপ্রতি ৭৫ কেজি করে হাঁসের খাদ্য। ৯২ জন ছাগল পালনকারী পেয়েছেন জনপ্রতি ২৫ কেজি করে ছাগলের খাদ্য। আর ৩৫ জন ভেড়া খামারির হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে জনপ্রতি ২৫ কেজি করে ভেড়ার খাদ্য।
প্রধান অতিথি ডা.একেএম আসজাদ তাঁর দৃপ্ত কণ্ঠে বলেন, প্রাণিসম্পদ খাত শুধু মাংস-ডিমের জোগান দেয় না, এটি গ্রামীণ অর্থনীতির মেরুদণ্ড। একজন খামারি বাঁচলে বাঁচবে দশটি পরিবার। তাই খামারিদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। সরকারের এ ধরনের সহায়তা অব্যাহত থাকবে, যাতে তাঁরা মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারেন, স্বাবলম্বী হতে পারেন।
সহকারী কমিশনার (ভূমি) একেএম রায়হানুর রহমান বলেন, সরকারের স্বপ্ন হলো গ্রামকে শহর বানানো নয়, গ্রামকে গ্রাম রেখেই উন্নত করা। গ্রামীণ অর্থনীতির হৃদপিণ্ড হলো কৃষি ও প্রাণিসম্পদ। আজকের এই সহায়তা খামারিদের জন্য এক বড় প্রেরণা। এই প্রেরণা থেকেই জন্ম নেবে নতুন নতুন উদ্যোক্তা।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা তরুণ বসু বলেন, মাছ, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি— সব মিলিয়েই সমন্বিত কৃষি। একটি ছাড়া অন্যটি অচল। টেকসই উন্নয়ন চাইলে আমাদের সব খাতকে একসাথে এগিয়ে নিতে হবে। এ ধরনের কার্যক্রম নিয়মিত হলে খামারিরা আর পিছিয়ে থাকবে না।
সভাপতির বক্তব্যে ডা. ভবেন বাইন আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, খামারির হাসিই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। আপনারা আমাদের পরিবারের সদস্য। আপনাদের পাশে থাকাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। আমার অনুরোধ, এই খাদ্য সঠিক নিয়মে ব্যবহার করুন। দেখবেন, উৎপাদন বাড়বে, খরচ কমবে, আর লাভের অঙ্কটা হাসবে আপনাদের ঘরে।
খাদ্যের বস্তা হাতে নিয়ে আনন্দে কেঁদে ফেলেন চরডাঙ্গা গ্রামের খামারি রহিমা বেগম। ভেজা চোখে তিনি বলেন, কয়দিন ধরে হাঁসগুলার খাওনের জোগাড় করতে পারতেছিলাম না। বাজারে খাবারের যে দাম! এই সহায়তা আমার জন্য আল্লাহর রহমত। এখন আমার হাঁসগুলা পেট ভরে খাবে, ডিমও দেবে বেশি। খরচও কিছুটা কমবে।
পাশেই দাঁড়ানো আরেক সুফলভোগী গোপালপুরের আব্দুল করিম বলেন, সরকার আমাদের কথা ভাবে, এটাই বড় শান্তি। এভাবে যদি বছরে দুই-একবার সহায়তা পাই, তাহলে আমরা ছোট খামারটারে বড় করতে পারব। পাঁচটা ছাগল থেকে পঞ্চাশটা বানানোর স্বপ্ন এখন আর আকাশ-কুসুম মনে হয় না।
এই খাদ্য বিতরণ কর্মসূচি শুধু কয়েক বস্তা খাদ্য দেওয়া নয়, এটি ১৯২টি পরিবারে নতুন আশার বীজ বপন করে দেওয়া। সংশ্লিষ্টদের মতে, এমন উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে আলফাডাঙ্গার গ্রামীণ অর্থনীতি আরও গতিশীল হবে, প্রাণিসম্পদ খাতে আসবে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। খামারির মুখের হাসিই বলে দেয়,উন্নয়নের সড়কটা গ্রামের মেঠোপথ দিয়েই গেছে।
বাংলাদেশ সময়: ১৮:০৮:৫১ ১৭ বার পঠিত