
বাংলাদেশে নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরকারি ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন উৎসের (যেমন BBS ও World Bank অনুমানভিত্তিক তথ্য) আলোকে দেখা যায়, নারীদের শ্রমশক্তি অংশগ্রহণ হার প্রায় ৩৫% থেকে ৪০% এর মধ্যে ওঠানামা করছে, যেখানে গ্রামীণ অঞ্চলে এই হার তুলনামূলকভাবে বেশি, কারণ কৃষি, গার্হস্থ্যভিত্তিক কাজ, অনানুষ্ঠানিক খাত এবং ক্ষুদ্র উদ্যোগে নারীদের সরাসরি সম্পৃক্ততা বেশি। গ্রামীণ নারীদের আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে দেখা যায় কৃষি সহায়তামূলক কাজ, ধান রোপণ ও সংগ্রহে অংশগ্রহণ, পশুপালন যেমন গরু, ছাগল ও হাঁস-মুরগি পালন, ক্ষুদ্র ব্যবসা যেমন সেলাই, কুটির শিল্প, হস্তশিল্প উৎপাদন, স্থানীয় বাজারে পণ্য বিক্রি, গার্মেন্টস শিল্পে শহরমুখী শ্রম, গৃহস্থালিভিত্তিক আয়ের কাজ এবং সাম্প্রতিক সময়ে অনলাইনভিত্তিক ছোট ব্যবসা, যেখানে মোবাইল ব্যাংকিং ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রামীণ নারীদের একটি বড় অংশ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রবেশ করেছে, বিভিন্ন এনজিও ও সমবায়ভিত্তিক কার্যক্রমের মাধ্যমে গ্রামীণ নারীদেমাঝে ঋণ বিতরণ এখন লক্ষাধিক পরিবারকে প্রভাবিত করছে, তবে বাস্তবতায় দেখা যায় এই ঋণের একটি অংশ পুনঃঋণ গ্রহণের চক্রে আটকে যায়, যেখানে অনেক নারী আগের ঋণ শোধ করতে নতুন ঋণ নিতে বাধ্য হন, ফলে প্রকৃত মুনাফার পরিবর্তে ঋণ নির্ভরতা তৈরি হয়। গার্মেন্টস শিল্পে নারীদের অংশগ্রহণ বাংলাদেশের মোট পোশাক খাতের শ্রমশক্তির প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি বলে বিভিন্ন শিল্প প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, যেখানে গ্রামীণ এলাকা থেকে আসা নারীরাই প্রধান অংশ, এই খাতে মাসিক আয়ের একটি স্থিতিশীল উৎস তৈরি হলেও দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, গড়ে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ, ওভারটাইম চাপ, শারীরিক ক্লান্তি এবং আবাসন সমস্যার কারণে জীবনমানের উপর চাপ তৈরি হয়। ডিজিটাল অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ দ্রুত বাড়ছে, মোবাইল ব্যাংকিং সেবার ব্যবহার (যেমন bKash, Nagad, Rocket) গ্রামীণ নারীদের মধ্যে নগদ অর্থ লেনদেন সহজ করেছে, অনুমান করা হয় দেশে কোটি কোটি নারী মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ব্যবহার করছে, তবে ডিজিটাল দক্ষতার ঘাটতি এখনো বড় বাধা, বিশেষ করে অনলাইন মার্কেটিং, ডিজিটাল পেমেন্ট ম্যানেজমেন্ট এবং প্রতারণা শনাক্তকরণ বিষয়ে সীমিত জ্ঞান রয়েছে। সামাজিক কাঠামোর পরিবর্তনের দিক থেকে দেখা যায়, যেসব পরিবারে নারী আয়ের সাথে যুক্ত, সেখানে প্রায়ই পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ে, যেমন সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা ব্যয়, গৃহস্থালির বড় কেনাকাটা, তবে সম্পূর্ণ আর্থিক নিয়ন্ত্রণ এখনো অধিকাংশ ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি, বিশেষ করে পিতৃতান্ত্রিক সামাজিক কাঠামোর কারণে।
শিক্ষার দিক থেকে দেখা যায়, গ্রামীণ নারীদের মধ্যে মাধ্যমিক বা তার বেশি শিক্ষিত অংশ তুলনামূলকভাবে বেশি উদ্যোক্তামুখী এবং প্রযুক্তি ব্যবহারকারী, এবং শিক্ষার হার বৃদ্ধির সাথে সাথে আয়-উপার্জনের বৈচিত্র্যও বাড়ছে, তবে এখনো একটি বড় অংশ প্রাথমিক বা নিম্ন মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকায় দক্ষতা উন্নয়নে পিছিয়ে আছে। সবমিলিয়ে গ্রামীণ নারীদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি একটি ধাপে ধাপে এগোনো প্রক্রিয়া, যেখানে পরিসংখ্যানগতভাবে অংশগ্রহণ বাড়লেও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, দক্ষতার ঘাটতি, বাজারে প্রবেশাধিকারের অসাম্য এবং সামাজিক নিয়ন্ত্রণ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে, ফলে এই অগ্রগতি বাস্তব হলেও এটি এখনো অসম, অনিয়মিত এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য আরও নীতিগত ও সামাজিক সহায়তা প্রয়োজন।
লেখক: বিএসএস (অনার্স), এমএসএস (অর্থনীতি), শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট,
বাংলাদেশ সময়: ০:২৬:২০ ৯ বার পঠিত