
গাজা উপত্যকায় ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণ সম্প্রসারণের পরিকল্পনার বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়ার জন্য কথিত আন্তর্জাতিক শান্তি বোর্ডের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলন হামাস। একই সঙ্গে এ বিষয়ে সংস্থাটির নীরবতার সমালোচনা করেছে সংগঠনটি।
গত শুক্রবার (২৯ মে) এক বিবৃতিতে হামাসের মুখপাত্র হাজেম কাসেম বলেন, গাজার ৭০ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেয়া এবং ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুত করার ইসরাইলি পরিকল্পনা নিয়ে আন্তর্জাতিক শান্তি বোর্ড ও গাজাবিষয়ক এর উচ্চ প্রতিনিধি নিকোলাই ম্লাদেনভের নীরবতা উদ্বেগজনক।
কাসেমের দাবি, এসব পরিকল্পনা গাজা নিয়ে বিদ্যমান যুদ্ধবিরতি কাঠামো ও সংশ্লিষ্ট সমঝোতার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তিনি বলেন, ইসরাইলের সম্প্রসারণবাদী নীতি ও ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক স্থানচ্যুত করার পরিকল্পনার নিন্দা না করা স্পনসর দেশগুলোর ভূমিকা ও ইসরাইলকে জবাবদিহির আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি নিয়ে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দেয়।
হামাস মুখপাত্র আন্তর্জাতিক শান্তি বোর্ডে প্রতিনিধিত্বকারী দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ইসরাইলের হুমকি ও যুদ্ধবিরতি চুক্তির বারবার লঙ্ঘনের বিষয়ে তাদের প্রকাশ্য ও সুস্পষ্ট অবস্থান নেওয়া উচিত।
পাশাপাশি গাজায় ইসরাইলের নীতি বন্ধে কার্যকর চাপ প্রয়োগেরও আহ্বান জানান তিনি। হামাসের মতে, গাজায় ইসরাইলের চলমান পদক্ষেপ আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও যুদ্ধবিরতি প্রচেষ্টাকে আরও ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গত বৃহস্পতিবার স্বীকার করেছেন যে, ইসরাইল গাজার ৬০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে এবং এই হার ৭০ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
এদিকে গাজায় যুদ্ধবিরতির চুক্তি কেবলই কাগজে-কলমে। বাস্তবে বিমান ও ড্রোন হামলায় প্রতিনিয়ত প্রাণ হারাচ্ছেন একের পর এক ফিলিস্তিনি। সম্প্রতি গাজা সিটির একটি আবাসিক ভবনে ইসরাইলি হামলায় পাঁচ শিশুসহ অন্তত ১০ জন নিহত হয়েছেন।
আন্তর্জাতিক চুক্তি অমান্য করে উপত্যকাজুড়ে ইসরাইল সামরিক বাহিনী তাদের নিয়ন্ত্রণ ও আগ্রাসন ক্রমশ বাড়িয়েই চলেছে। একই সঙ্গে ত্রাণবাহী জাহাজের ফরাসি মানবাধিকার কর্মীদের ওপর ইসরাইলি বাহিনীর বর্বর নির্যাতনের ঘটনায় বিশ্বজুড়ে তৈরি হয়েছে তীব্র ক্ষোভ।
মার্কিন মধ্যস্থতায় হওয়া শান্তি চুক্তি ও যুদ্ধবিরতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে গাজাজুড়ে অব্যাহত রয়েছে ইসরাইলের ভয়াবহ বিমান ও ড্রোন হামলা। সম্প্রতি গাজা সিটির একটি আবাসিক ভবনে ইসরাইল হামলায় শিশুসহ বেশ কয়েকজন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
ইসরাইলের দাবি, তারা হামাসের ব্যাটালিয়ন কমান্ডার ইমাদ আসলীমকে লক্ষ্য করে এই হামলা চালিয়েছে। এর ঠিক আগের দিনই হামাসের সামরিক শাখার নবনিযুক্ত প্রধান মোহাম্মদ ওদেহ সপরিবারে ইসরাইল হামলায় নিহত হন। এছাড়া খান ইউনিস ও আল-তুফাহ এলাকায় পৃথক হামলায় আরও কয়েকজন ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন।
এদিকে গাজা অভিমুখে যাওয়া ত্রাণবাহী জাহাজের ফিলিস্তিনপন্থি ফরাসি মানবাধিকার কর্মীদের ওপর ইসরাইল বাহিনীর বর্বর নির্যাতনের ঘটনা সামনে এসেছে। ফ্লোটিলা থেকে আটক কয়েকশ অ্যাক্টিভিস্টের ওপর যৌন সহিংসতা, মারধর, তীব্র ঠাণ্ডার মধ্যে ফেলে রাখা এবং প্রতিনিয়ত অবমাননার অভিযোগ উঠেছে।
এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জঁ-নোয়েল বারোট ফরাসি নাগরিকদের ওপর নির্যাতনের বিষয়টি তদন্ত করতে পাবলিক প্রসিকিউটরকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানিয়েছেন।
আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ সত্ত্বেও কোনো কার্যকর নিষেধাজ্ঞা না থাকায় ইসরাইল তার আগ্রাসী নীতি জারি রেখেছে। বর্তমান বৈশ্বিক রাজনীতিতে ইরান ও লেবানন সংকটের দিকে বিশ্ববাসীর নজর থাকার পূর্ণ সুযোগ নিচ্ছে নেতানিয়াহু প্রশাসন।
মার্কিন প্রশাসন গাজা পরিস্থিতি নিয়ে দৃশ্যত উদাসীন থাকায় এবং তথাকথিত ‘বোর্ড অফ পিস’ নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করায়, গাজার ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ এবং তাদের স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার অধিকার চরম হুমকির মুখে পড়েছে।
আন্তর্জাতিক আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এবং বিশ্ব সম্প্রদায়ের নীরবতার সুযোগ নিয়ে গাজাকে অবরুদ্ধ করে ফেলেছে ইসরাইল। যুদ্ধবিরতির আড়ালে প্রতিনিয়ত হামলা এবং ফিলিস্তিনিদের চিরতরে বিতাড়িত করার এই নির্মম নীতি মধ্যপ্রাচ্যের সংকটকে এক অন্ধকার ও অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
বাংলাদেশ সময়: ১৩:২৯:৩৭ ৮ বার পঠিত