
সদরপুর (ফরিদপুর) প্রতিনিধি : “জীবনে সাতবার ঘর তুলেছি বাবা, সাতবারই পদ্মায় ভাসাইয়া লইয়া গেল। এই বয়সে এসে আর নতুন করে খুঁটি পোতার শক্তি নাই। এখন অন্যের আশ্রয়ে পড়ে আছি। জানি না, শেষ নিঃশ্বাসটা নিজের একটা ঘরের ছায়ায় বইসা নিতে পারবো কিনা…” কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে, চোখে জল নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার আকোট ইউনিয়নের গুচ্ছ গ্রামের ৯০ বছর বয়সী বৃদ্ধ ইউনুছ শেখ।
জীবনের শেষ প্রান্তে এসে যখন একটু শান্তিতে নিজের ভিটেমাটিতে ঘুমানোর কথা, ঠিক তখনই সর্বগ্রাসী পদ্মা কেড়ে নিয়েছে তাঁর শেষ সম্বলটুকু।পদ্মার ভয়াল থাবায় ৪ কন্যা ১টি পুত্র ও স্ত্রী নিয়ে এক অনিশ্চিত আশ্রিত ঘরে মানবেতর দিন কাটছে এই বৃদ্ধের। চোখের সামনে নিজের হাতে গড়া বাড়ি, আবাদি জমি আর জীবনের বহু স্মৃতি নদীগর্ভে বিলীন হতে দেখেছেন তিনি।
আতঙ্ক আর নির্ঘুম রাতের সদরপুর ইউনুছ শেখের এই দীর্ঘশ্বাস কেবল তাঁর একার নয়; সদরপুরের পদ্মা আড়িয়াল খা তীরবর্তী হাজারো মানুষের নিয়তি এখন এটাই। বর্ষা এলেই এ অঞ্চলে শুরু হয় সর্বনাশা খেলা। পানি বাড়ার সাথে সাথে বাড়ে ভাঙনের আতঙ্ক, কাটে নির্ঘুম রাত।
বর্তমানে যেসব এলাকায় তীব্র ভাঙন চলছে:
• ঢেউখালী ইউনিয়ন: শয়তানখালী ও বেপারীডাঙ্গী গ্রাম।
• আকোটেরচর ইউনিয়ন: ছলেনামা ও আকোট গ্রাম।
ইতোমধ্যে এসব এলাকার প্রায় ৮ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে শত শত বিঘা ফসলি জমি ও প্রায় ২শত ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।
চরম ঝুঁকিতে স্কুল, বাজার ও আশ্রয়ণ প্রকল্প
স্থানীয়রা জানান, ভাঙন যেভাবে এগোচ্ছে তাতে যেকোনো মুহূর্তে বিলীন হয়ে যেতে পারে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। চরম ঝুঁকিতে রয়েছে: ১. আকোট জনসংঘ উচ্চ বিদ্যালয় ২. দুটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ৩. ঐতিহ্যবাহী পিয়াজখালী বাজার ৪. সরকারি আশ্রয়ণ ও গুচ্ছগ্রামসহ প্রায় ১০টি গ্রাম।এছাড়াও চর নাসিরপুরের আড়িয়াল খাঁ নদের চৌধুরির হাট,শিমুলতলি বাজার ঘাট ঝুকিতে রয়েছে ।
“ত্রাণ চাই না, স্থায়ী বাঁধ চাই” স্থানীয়দের ক্ষোভ
বছরের পর বছর ধরে ভাঙন চললেও স্থায়ী বাঁধ না হওয়ায় স্থানীয়দের মনে তীব্র ক্ষোভের আগুন। অনেক পরিবার এখন ঘরবাড়ি ভেঙে নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটে চলেছে। এলাকাবাসীর স্পষ্ট দাবি— ত্রাণের চাল-ডাল নয়, তারা পদ্মার বুকে টেকসই ও স্থায়ী বেড়িবাঁধ চান।
কয়েকদিন ধরে উজান থেকে তীব্র গতিতে ধেয়ে আসা পদ্মার তীব্র স্রোত ও অব্যাহত ভাঙনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে পুরো এলাকায়। অনেক পরিবার ঘরবাড়ি সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কেউ কেউ ইতোমধ্যে নিরাপদ স্থানে চলে গেছেন।
যা বলছেন জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসন-
• আসলাম বেপারী (চেয়ারম্যান, আকোটের চর ইউনিয়ন):
“ভাঙনের ভয়াবহতা পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে জানানো হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য যোগাযোগ করা হচ্ছে।”
• নুরুনাহার (উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা):
“আমরা ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ ও তালিকা প্রস্তুতের কার্যক্রম শুরু করেছি। সরকারি বরাদ্দ পাওয়া সাপেক্ষে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য প্রয়োজনীয় মানবিক সহায়তা ও ত্রাণসামগ্রী বিতরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
• শরীফ শাওন (উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা - ইউএনও):
“পদ্মার ভাঙন পরিস্থিতি উপজেলা প্রশাসন গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে। নদীভাঙন রোধে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
শেষ কথা
পদ্মার ভয়াল থাবায় বছরের পর বছর ধরে সর্বস্ব হারানো মানুষের দীর্ঘশ্বাস যেন থামছেই না। ইউনুছ শেখের মতো হাজারো মানুষ চাতক পাখির মতো চেয়ে আছেন— কবে মিলবে এই ভাঙনের স্থায়ী সমাধান? কবে থামবে পদ্মার এই রাক্ষুসী রূপ?
বাংলাদেশ সময়: ১৭:৩৫:০৩ ২৬ বার পঠিত