
ধনবাড়ী প্রতিনিধি : জীবনের শেষ প্রান্তে সন্তানের স্নেহ-ভালোবাসা ও নিরাপদ আশ্রয়ের প্রত্যাশা থাকলেও সেই আশ্রয় থেকেই বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগ তুলেছেন টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী উপজেলার যদুনাথপুর ইউনিয়নের নেটামশরা গ্রামের বাসিন্দা মোছাঃ চম্পা বেগম (৮০)। চার ছেলে ও দুই মেয়ের জননী এই বৃদ্ধার দাবি, ছেলেরা দীর্ঘদিন ধরে তার ভরণপোষণের দায়িত্ব পালন করছেন না। এমনকি বসবাসের ঘর ভেঙে দিয়ে তাকে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। এ ঘটনায় প্রতিকার চেয়ে তিনি প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
অভিযোগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় ১৪ বছর আগে স্বামী ইউনুছ আলীর মৃত্যুর পর থেকেই পরিবারে বিরোধের সৃষ্টি হয়। বয়সের ভারে চলাফেরায় অক্ষম চম্পা বেগমের অভিযোগ, তার তিন ছেলে—আব্দুল কাদের, আব্দুল আজিজ ও ইব্রাহিম—দীর্ঘদিন ধরে তার দেখাশোনা ও ভরণপোষণের দায়িত্ব পালন করছেন না।
চম্পা বেগম জানান, প্রথমে বড় ছেলে আব্দুল কাদেরের জায়গায় একটি ঘরে বসবাস করতেন। সেখানে বিভিন্ন সময় মানসিক নির্যাতনের শিকার হন। একপর্যায়ে নাতি পারভেজের লাঠির আঘাতে আহত হওয়ার পর ছোট ছেলে ইব্রাহিম ও নাতি সেলিম তার ঘরটি সরিয়ে দ্বিতীয় ছেলে আব্দুল আজিজের জায়গায় নতুন করে নির্মাণ করে দেন।
কিন্তু সেই ঘরেও স্থায়ীভাবে থাকতে পারেননি তিনি। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রায় ১০ দিন আগে আব্দুল আজিজ ঘরটি ভেঙে ফেলেন এবং তাকে সেখান থেকে চলে যেতে বাধ্য করেন। বর্তমানে তিনি বড় ছেলে চান মিয়ার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। তবে জীবনের শেষ সময়টুকু নিজের স্বামীর ভিটায় কাটানোর আকাঙ্ক্ষার কথা জানিয়েছেন তিনি।
সরেজমিনে দেখা যায়, পরিবারের পক্ষ থেকে বৃদ্ধার জন্য একটি জরাজীর্ণ ঘর নির্মাণ করা হয়েছে, যা একটি পরিত্যক্ত নর্দমার পাশে অবস্থিত। স্থানীয়দের মতে, ঘরটি বসবাসের অনুপযোগী এবং একজন বৃদ্ধ নারীর জন্য সেখানে নিরাপদে বসবাস করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য।
ঘটনার পর চম্পা বেগমের দুই মেয়ে ও তাদের স্বামীরা স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে একাধিকবার সালিশের উদ্যোগ নিলেও অভিযুক্ত ছেলেরা উপস্থিত না হওয়ায় কোনো সমাধান হয়নি। পরে তিনি প্রশাসনের শরণাপন্ন হন।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে চম্পা বেগম বলেন,
“স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকেই কষ্টে আছি। ছেলেরা আমার ভরণপোষণ দেয় না, থাকার ঘরও ভেঙে দিয়েছে। এখন অন্যের বাড়িতে থাকতে হচ্ছে। আমি শুধু নিজের স্বামীর ভিটায় শেষ জীবনটা কাটাতে চাই।”
অভিযোগের বিষয়ে আব্দুল কাদের ও ইব্রাহিম বলেন, চার ভাই মিলে বাবার কবরের পাশে তাদের মায়ের জন্য নতুন একটি ঘর নির্মাণ করবেন। পাশাপাশি দুই বোনের প্রাপ্য জমিও নিয়ম অনুযায়ী বুঝিয়ে দেওয়া হবে।
তবে অভিযুক্ত আব্দুল আজিজের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলে সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে তিনি সেখান থেকে চলে যান। ফলে এ বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
স্থানীয়দের দাবি, মৃত ইউনুছ আলীর নামে প্রায় ৩৬ শতাংশ জমি থাকলেও এখনো তা উত্তরাধিকারীদের নামে বণ্টন হয়নি। আইন অনুযায়ী চম্পা বেগম এবং তার দুই মেয়েরও ওই সম্পত্তিতে বৈধ অধিকার রয়েছে। অথচ জমি থাকা সত্ত্বেও বৃদ্ধা মায়ের স্থায়ীভাবে বসবাসের ব্যবস্থা করা হয়নি।
এ বিষয়ে ধনবাড়ী থানার এসআই মো. আরিফুল হাসান বলেন, “অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রশাসনের কার্যকর হস্তক্ষেপে চম্পা বেগম তার ন্যায্য ভরণপোষণ ও বসবাসের অধিকার ফিরে পাবেন এবং জীবনের শেষ সময়টুকু নিজ ভিটায় নিরাপদে কাটানোর সুযোগ নিশ্চিত হবে।
বাংলাদেশ সময়: ১৬:৩৬:২৩ ৪৪ বার পঠিত