![]()
সাবেক প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ বলেন, একটি দেশের বিচার বিভাগের গুণমানই তার প্রধান অর্থনৈতিক সূচক। তিনি বলেন, “দ্রুত, কার্যকর এবং স্বচ্ছ বিচার ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মাধ্যমে আমরা বাণিজ্যিক ন্যায়বিচারের জন্য একটি শক্তিশালী কাঠামো নির্মাণ করছি।”
আজ শনিবার রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের ক্রিস্টাল বলরুমে বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল আরবিট্রেশন সেন্টার (বিআক) প্রতিষ্ঠার ১৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রথম বাংলাদেশ এডিআর সামিট অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
সাবেক প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ আরো বলেন, একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বায়িত অর্থনীতিতে, দেশি ও বিদেশি উভয় বিনিয়োগকারীই কোনো দেশকে শুধুমাত্র কর ছাড় বা অবকাঠামো দিয়ে বিচার করেন না। তাঁরা নিশ্চয়তা খোঁজেন। তাঁরা এই আশ্বাস চান যে চুক্তিগুলো সম্মানিত হবে, অধিকার সুরক্ষিত থাকবে এবং বিরোধগুলো কয়েক দশকে নয়, বরং কয়েক মাসের মধ্যেই নিষ্পত্তি হবে।
সাবেক প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ বিচারব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও ব্যবসাবান্ধব আইনি পরিবেশ গড়ে তুলতে এডিআরের গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ার। এছাড়া বিআক-এর পরিচালনা পর্ষদের সদস্য, দেশের বিশিষ্ট আইনজীবী এবং ব্যাংকিং ও করপোরেট খাতের প্রতিনিধিরা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন।
নিবন্ধন ও সৌহার্দ্য বিনিময়ের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের পর বিআক-এর চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান অতিথি ও অংশগ্রহণকারীদের স্বাগত জানান। স্বাগত বক্তব্যে তিনি প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বিআক-এর পথচলা, বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক সালিশ ও মধ্যস্থতা ব্যবস্থার বিকাশে প্রতিষ্ঠানটির গুরুত্বপূর্ণ অবদান এবং বিচার বিভাগ, আইনজীবী সমাজ, ব্যবসায়ী সম্প্রদায় ও অন্যান্য অংশীজনের ধারাবাহিক সহযোগিতার কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।
এরপর “বিয়াক নিয়ে প্রতিফলন : ২০১১-২০২৬ শীর্ষক বিশেষ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। বিআক-এর ভাইস চেয়ারম্যান মুহাম্মদ এ (রুমী) আলী-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ অধিবেশনে বক্তব্য দেন সাবেক বিচারপতি মো. আওলাদ আলী, আফতাবুল ইসলাম, ড. খালেদ হামিদ চৌধুরী এবং রিজওয়ান রহমান। বক্তারা বিগত ১৫ বছরে বিআক-এর অগ্রযাত্রা, বাংলাদেশে এডিআর ব্যবস্থার বিকাশে এর অবদান এবং বাণিজ্যিক বিরোধ নিষ্পত্তিতে প্রাতিষ্ঠানিক সালিশ ও মধ্যস্থতার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
প্রতিষ্ঠার ১৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে বিআক-এর পরিচালনা পর্ষদের সদস্য এবং ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে কেক কেটে প্রতিষ্ঠানের এ গৌরবময় মাইলফলক উদযাপন করেন।
এ সময় বাংলাদেশে শান্তিপূর্ণ, কার্যকর ও ব্যয়-সাশ্রয়ী উপায়ে বাণিজ্যিক বিরোধ নিষ্পত্তি এবং এডিআর ব্যবস্থার প্রসারে বিআক-এর অব্যাহত অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়।
অনুষ্ঠানের মূল প্রবন্ধে ‘এডিআরের মাধ্যমে ন্যায়বিচার ও ব্যবসায়িক আস্থা শক্তিশালীকরণ’ প্রতিপাদ্যের ওপর আলোকপাত করেন বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ার। তিনি বলেন, প্রচলিত বিচারব্যবস্থার কার্যকর পরিপূরক হিসেবে এডিআর দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তি, ন্যায়বিচারে সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিতকরণ এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগের জন্য একটি অধিকতর পূর্বানুমানযোগ্য ও আস্থাশীল আইনি পরিবেশ গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনের পর একই প্রতিপাদ্যের ওপর একটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। ব্যারিস্টার সামীর সাত্তার-এর সঞ্চালনায় আলোচনায় অংশ নেন ব্যারিস্টার তানিম হোসেন শাওন, মোহাম্মদ মামদুদুর রশীদ, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক পিএলসি; ব্যারিস্টার মোহাম্মদ ফররুখ রহমান; অধ্যাপক ড. মিলিতা মেহজাবীন, চেয়ারম্যান, ন্যাশনাল ব্যাংক পিএলসি এবং ব্যারিস্টার মারজুক কবির।
আলোচনায় বক্তারা বিচারব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধি, বাণিজ্যিক বিরোধ নিষ্পত্তি, বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে এডিআর-এর ক্রমবর্ধমান ভূমিকার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। একই সঙ্গে বিচার বিভাগ, আইনজীবী সমাজ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন।
পরে প্রাণবন্ত প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশগ্রহণকারীরা সালিশ, মধ্যস্থতা এবং অন্যান্য এডিআর প্রক্রিয়া সম্পর্কিত সমসাময়িক চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা নিয়ে প্যানেল সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। অংশগ্রহণকারীদের সক্রিয় উপস্থিতি বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক এডিআরের প্রতি ক্রমবর্ধমান আগ্রহ ও আস্থার প্রতিফলন ঘটায়।
বিআক-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কে এ এম মাজেদুর রহমানের ধন্যবাদ জ্ঞাপনের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শেষ হয়।
বাংলাদেশের প্রথম এডিআর সামিট বিআক-এর প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে। প্রতিষ্ঠার ১৫ বছর পূর্তির এই আয়োজন বিচারক, আইনজীবী, শিক্ষাবিদ, ব্যবসায়ী নেতা এবং এডিআর বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতবিনিময়ের একটি কার্যকর প্ল্যাটর্ফম সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে সালিশ, মধ্যস্থতা এবং অন্যান্য বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থার আরও বিস্তার, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং টেকসই অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক উন্নয়নে অংশীজনদের মধ্যে সহযোগিতা জোরদারের ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
বাংলাদেশ সময়: ১৫:৫৭:০০ ৩ বার পঠিত