
প্রিয় সুপারহিরোর পোশাক পরে ইন্দোনেশিয়ার কিশোর রুদিয়ানসাহ পোড়া জমির ওপর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। বোর্নিও দ্বীপের বিস্তীর্ণ এলাকা পুড়িয়ে দেওয়া দাবানল নেভাতে তিনি পানি ছিটিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে কাজ করছেন।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ ইন্দোনেশিয়া ভয়াবহ দাবানলের সঙ্গে লড়াই করছে। এসব আগুনে দ্বীপটির বিভিন্ন এলাকায় ঘন ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়েছে। দ্বীপটির কিছু অংশ ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও ব্রুনেইয়ের মধ্যে বিভক্ত।
ইন্দোনেশিয়ার পালাংকারায়া থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।
পালাংকারায়া শহরের আশপাশের পোড়া ও বিবর্ণ ভূমিতে রুদিয়ানসাহর লাল-নীল সুপারম্যানের পোশাক সহজেই চোখে পড়ে। বাবার গড়ে তোলা স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী অগ্নিনির্বাপণ দলের সঙ্গে যোগ দিয়ে তিনি ধিকিধিকি জ্বলতে থাকা পিটভূমির আগুন নেভাচ্ছেন।
১৭ বছর বয়সী রুদিয়ানসাহ এএফপিকে বলেন, ২০২৩ সাল থেকে স্কুলের পর অবসর সময়ে বাবার সঙ্গে আগুন নেভানোর কাজে যুক্ত হয়েছেন তিনি।
তবে এ বছর আগুন নেভানোর সময় উজ্জ্বল রঙের পোশাক পরার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এতে আগুন নিয়ন্ত্রণের লড়াইয়ের দৃশ্যটি আরও দৃষ্টিকাড়া হয়ে ওঠে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে তার এই প্রচেষ্টা মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
রুদিয়ানসাহ বলেন, মানুষটির পোশাক পরা ছিল ‘শুধুই উৎসাহ জাগানোর জন্য।’ তবে আগুন নেভাতে পাইপ দিয়ে গাছপালায় পানি ছিটানোর তার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ভিডিওটি লাখ লাখ বার দেখা হয়েছে। দেশটির বনমন্ত্রী তাকে ‘বননায়ক’ উপাধি দিয়েছেন।
রুদিয়ানসাহ রোববার এএফপিকে বলেন, ‘সত্যি বলতে, স্থানীয়দের সাহায্য করতে পারছি বলে আমি খুব খুশি। যদিও এতে খুব ক্লান্ত লাগে।’ এ সময়ও তার গায়ে সুপারম্যানের চাদর ছিল।
তিনি বলেন, মাঠে যাওয়ার আগে পোশাকটি সামান্য ভিজিয়ে নেন, যাতে আগুনে সেটি পুড়ে না যায়। পরিষ্কার রাখতে প্রতি রাতে পোশাকটি ধুয়ে ফেলেন।
-‘স্বাভাবিক কিশোর’-
রুদিয়ানসাহর বাবা মুলিয়াদি এএফপিকে বলেন, চলতি বছরের দাবানলের ধোঁয়াশা ২০২০ সালে স্বেচ্ছাসেবী অগ্নিনির্বাপণ দলটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেখা সবচেয়ে ভয়াবহ।
চাদর পরা ছেলেকে নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বাড়িতে সে আর দশটা স্বাভাবিক ছেলের মতোই।’
তিনি বলেন, ‘কিন্তু আমাকে বাইরে যেতে দেখে সে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি কি আগুন নেভাতে যাচ্ছ? আমি তোমার সঙ্গে যাব।’
মুলিয়াদি বলেন, অগ্নিনির্বাপকদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো পানির সংকট। খরার কারণে কূপসহ পানির অন্যান্য উৎস শুকিয়ে যাচ্ছে।
সরকার এ সপ্তাহে জানিয়েছে, জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত আগুনে ২ লাখ হেক্টরের বেশি জমি পুড়ে গেছে। এটি রাজধানী জাকার্তার আয়তনের প্রায় তিন গুণ।
এল নিনোর আগের মৌসুমগুলোর তুলনায় এ বছর এরই মধ্যে বেশি জমি পুড়েছে। এল নিনো এমন একটি আবহাওয়াগত পরিস্থিতি, যা বিশ্বজুড়ে বাতাস, বায়ুচাপ ও বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন ঘটায়। ২০১৯ ও ২০২৩ সালের এল নিনো মৌসুমেও দাবানল হয়েছিল।
দাবানল ও ধোঁয়ার নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত সেনা ও বিমান মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছে সরকার। ধোঁয়া ইতোমধ্যে প্রতিবেশী মালয়েশিয়াতেও পৌঁছেছে।
এল নিনো একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনা। ইন্দোনেশিয়ায় এটি সাধারণত খরা নিয়ে আসে। এতে দাবানলের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে জলবায়ু পরিবর্তন এল নিনোর প্রভাব আরও বাড়াতে পারে। কারণ উষ্ণ সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডল চরম আবহাওয়ার ঘটনা তীব্র করার জন্য আরও বেশি শক্তি ও আর্দ্রতা সরবরাহ করে।
ভবিষ্যতে বনরক্ষী হওয়ার স্বপ্ন দেখা রুদিয়ানসাহ আগুন নেভানোর চ্যালেঞ্জের মধ্যেও অগ্নিনির্বাপকদের কাজ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘ইন্দোনেশিয়াজুড়ে স্বেচ্ছাসেবী ও অগ্নিনির্বাপকদের বলছি, আগুনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মনোবল ধরে রাখুন।’
বাংলাদেশ সময়: ১৬:৪৪:১০ ২ বার পঠিত