![]()
সদরপুর (ফরিদপুর) প্রতিনিধি: একদিকে বাবার হাত ধরে দাঁড়িয়ে দুই জীবিত কন্যা, অন্যদিকে সেই বাবার হাতেই বাক্সবন্দি আরেক কন্যার নিথর দেহ—সদরপুরে এমন এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের সাক্ষী হয়েছেন স্থানীয়রা।
গত ২৩ আগস্ট রবিবার, মাগরিবের নামাজের আর মাত্র কয়েক মিনিট বাকি। ফরিদপুর জেলার সদরপুর এতিমখানা মাদ্রাসা মার্কেটের সামনে হঠাৎ দেখা হয় সদরপুর সরকারি কলেজের কর্মচারী সেকেন্দার মাতুব্বরের সঙ্গে। তাঁর সঙ্গে ছিলেন দুই কন্যা—ফারজানা ও ফারহানা। দুজনই বাবার হাত ধরে দাঁড়িয়ে ছিল।
তবে সেকেন্দার মাতুব্বরের হাতে থাকা একটি বাক্স মুহূর্তেই পুরো দৃশ্যটিকে বিষাদে পরিণত করে।
জানেন, সেই বাক্সের ভেতরে কী ছিল?
একজন বাবার স্বপ্নকন্যা।
হ্যাঁ, সত্যিই—বাক্সের ভেতরে ছিল তাঁর সদ্য পৃথিবী ছেড়ে যাওয়া ছোট্ট শিশুকন্যার নিথর দেহ।
সেকেন্দার মাতুব্বরের স্ত্রী শিখা আক্তারের গর্ভে জন্ম নেওয়া শিশুকন্যাটি জন্মের পর থেকেই ঢাকার একটি হাসপাতালে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিল। চিকিৎসাধীন অবস্থায় অবশেষে শিশুটি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে।
ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
স্ত্রীকে ঢাকার হাসপাতালে রেখেই নিজের আদরের মৃত কন্যাকে একটি বাক্সে করে সদরপুরে নিয়ে ফিরতে হয় বাবা সেকেন্দারকে—জানাজা ও দাফনের জন্য।
অসুস্থ অবস্থাতেও দায়িত্ব পালন করছিলেন মা
এই মর্মান্তিক ঘটনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও একটি হৃদয়বিদারক অধ্যায়। শিশুটির মা শিখা আক্তার সরকারি প্রকল্পভুক্ত একটি এনজিওতে কর্মরত। শারীরিক অসুস্থতা থাকা সত্ত্বেও তিনি নিয়মিত তাঁর দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছিলেন।
স্বামী সেকেন্দার মাতুব্বর আক্ষেপ করে বলেন, “কতবার বললাম, অফিস থেকে দুই মাস আগেই ছুটি নাও। কিন্তু না, সে এ অবস্থায় ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করে যায়। আর আজ এ দশা!”
স্বামীর এই আক্ষেপ যেন পুরো ঘটনার বেদনার গভীরতাকেই আরও স্পষ্ট করে তোলে। একদিকে অসুস্থ স্ত্রী হাসপাতালে, অন্যদিকে সদ্য পৃথিবী ছেড়ে যাওয়া সন্তানকে নিয়ে একা বাড়ি ফিরতে হচ্ছে বাবাকে।
বাবার হাতে বাক্স, পাশে দুই জীবিত কন্যা
মুহূর্তটির দৃশ্য ছিল অত্যন্ত নির্মম—বাবার হাত ধরে দুই কন্যা জীবনের পথে দাঁড়িয়ে আছে, আর বাবার হাতেই বাক্সবন্দি আরেক কন্যার শেষযাত্রা।
যে সন্তানকে ঘিরে ছিল ভবিষ্যতের কত স্বপ্ন, যে সন্তানকে ঘিরে ছিল বাবা-মায়ের কত আশা-আকাঙ্ক্ষা, সেই সন্তানকেই শেষবারের মতো কোলে নিয়ে নয়, একটি বাক্সে করে বাড়ি ফিরতে হলো বাবাকে।
সন্তান হারানোর এই বেদনা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। একজন বাবা-মায়ের কাছে সন্তানের মৃত্যু যে কতটা অসহনীয়, তা কেবল তাঁরাই অনুভব করতে পারেন।
বিষয়টি নিয়ে সদরপুর সরকারি কলেজ মসজিদের পেশ ইমাম মুফতী মুহাম্মাদ জাকির হুসাইন ফরিদী গতকাল রাতে তাঁর ফেসবুক পোস্টে হৃদয়স্পর্শীভাবে ঘটনাটি তুলে ধরেন।
আল্লাহ তাআলা ছোট্ট শিশুটিকে জান্নাতের ফুল হিসেবে কবুল করুন। শোকসন্তপ্ত বাবা সেকেন্দার মাতুব্বর, মা শিখা আক্তার এবং তাঁদের পরিবারের সবাইকে এই কঠিন শোক ধৈর্যের সঙ্গে সহ্য করার তাওফিক দান করুন। তাঁদের কষ্ট ও ত্যাগের উত্তম প্রতিদান দুনিয়া ও আখিরাতে দান করুন।
বাংলাদেশ সময়: ১৭:২৭:০৮ ১৮ বার পঠিত