
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদে সম্ভাব্য জয়ের পাশাপাশি সিনেট নির্বাচনেও ঐতিহাসিক সাফল্য পেয়েছে ডেমোক্রেটিক পার্টি। রিপাবলিকানদের দীর্ঘদিনের আধিপত্য ভেঙে মার্কিন সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করেছে দলটি।
সদ্য সমাপ্ত মধ্যবর্তী নির্বাচনের বেসরকারি ফলাফলের বরাত দিয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। তবে রিপাবলিকানদের এই পরাজয়ের পেছনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দায় রয়েছে বলে মনে করছে সংবাদমাধ্যমটি।
যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্যের সংখ্যা ৫০টি এবং সিনেটের মোট আসন ১০০টি। প্রতিটি অঙ্গরাজ্য থেকে দুজন করে প্রতিনিধি সিনেটে নির্বাচিত হন।
কংগ্রেসের এই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেতে বিজয়ী দলের প্রার্থীদের অন্তত ৫১টি আসনে জয়ী হতে হয়। এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে সিনেটের ৩৫টি আসনে ভোট গ্রহণ হয়েছে।
বেসরকারি সূত্রে পাওয়া ফলাফল অনুযায়ী, এই ৩৫টি আসনের মধ্যে ১৫টিতে জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা। এতে সিনেটে দলটির আসনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫২টিতে। ফলে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ এখন ডেমোক্রেটিক পার্টির হাতে।
ডেমোক্র্যাটদের জয়ের ধারা আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ১৫টি আসনে জয়ের পাশাপাশি আরও তিনটি আসনে এগিয়ে রয়েছেন দলটির প্রার্থীরা।
এর মধ্য দিয়ে ২০২২ সালের পর প্রথমবারের মতো কংগ্রেসের উভয় কক্ষের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে যাচ্ছে ডেমোক্র্যাটরা। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেয়াদের বাকি সময়ে তাঁর নীতি ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এই জয় বড় ধরনের মনস্তাত্ত্বিক বাধা তৈরি করবে।
বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, যেসব অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্র্যাটরা বহু বছর, এমনকি কয়েক দশক ধরে জয়ের দেখা পায়নি, সেসব স্থানেও এবার অভাবনীয় সাফল্য এসেছে। সাউথ ক্যারোলিনা, নর্থ ক্যারোলিনা, ওহাইও, টেক্সাস, আইওয়া ও কানসাসের মতো রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটিতে শক্তিশালী প্রার্থী দিয়ে জয় পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। এতে দেশটির ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন এসেছে।
মিনেসোটা ও মিশিগানে এখনো ভোট গণনা চলছে। সেখানে বিদায়ী ডেমোক্র্যাট সিনেটরদের আসন ধরে রাখার চেষ্টা করছে দলটি। অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাটদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত অঙ্গরাজ্য মেইনে একমাত্র রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্সকে পরাজিত করার লড়াই চালাচ্ছে তারা। এ ছাড়া আলাস্কায় দুই মেয়াদের রিপাবলিকান সিনেটর ড্যান সুলিভানকে হারানোর প্রত্যাশা করছে ডেমোক্র্যাটরা। তবে অঙ্গরাজ্যটির চূড়ান্ত ফল প্রকাশে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।
২০২৪ সালের নির্বাচনে হোয়াইট হাউসে ফিরে আসার পাশাপাশি সিনেটে রিপাবলিকানদের ৫৩ আসনের স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করেছিলেন ট্রাম্প। এরপর ২০২৬ সালের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনাকে প্রায় অসম্ভব বলে মনে করেছিলেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। কারণ, এবার যেসব অঙ্গরাজ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেগুলোর বেশির ভাগই ছিল দুই দলের নিজ নিজ শক্ত ঘাঁটি। এ ছাড়া সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মার্কিন ভোটারদের ভিন্ন দলের প্রার্থীদের ভোট দেওয়ার প্রবণতাও অনেকটা কমে এসেছিল।
অন্যদিকে, রিপাবলিকানদের প্রত্যাশা ছিল, ডেমোক্র্যাটদের দুর্বল ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত জর্জিয়া, নিউ হ্যাম্পশায়ার ও মিশিগানে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলে নিজেদের আসনসংখ্যা বাড়াবে তারা। তবে জর্জিয়া ও নিউ হ্যাম্পশায়ারে সেই চেষ্টা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরু হওয়ার পর থেকেই অবশ্য রাজনৈতিক পরিস্থিতি ধীরে ধীরে ডেমোক্র্যাটদের অনুকূলে যেতে শুরু করে। বিশেষ করে অর্থনীতি ও অভিবাসনসংক্রান্ত অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তগুলোতে চরম ব্যর্থতার কারণে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা দ্রুত কমতে থাকে।
এরপর ইরানে সামরিক হামলা এবং মিনিয়াপোলিসে অভিবাসন বাহিনীর প্রকাশ্য অভিযানে দুই মার্কিন নাগরিকের প্রাণহানির ঘটনায় সাধারণ মানুষের ক্ষোভ আরও বেড়ে যায়। মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রভাবে জ্বালানি তেলের দাম ক্রমাগত বাড়তে থাকায় টেক্সাস, কানসাস ও আইওয়ার মতো রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটিতেও জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে ডেমোক্র্যাটরা।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কানসাসে ১৯৩২ সালের পর এবং টেক্সাসে ১৯৮৮ সালের পর এই প্রথম কোনো ডেমোক্র্যাট প্রার্থী সিনেটর নির্বাচিত হলেন। এ ছাড়া সাউথ ক্যারোলিনায় ৩৮ বছর এবং আইওয়া ও নর্থ ক্যারোলিনায় দীর্ঘ ১৮ বছর পর জয়ের দেখা পেল ডেমোক্রেটিক পার্টি।
রিপাবলিকান দলের অভ্যন্তরীণ প্রাথমিক নির্বাচন বা প্রাইমারিতে ট্রাম্পের অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপকেও দলটির পতনের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। নর্থ ক্যারোলিনার রিপাবলিকান সিনেটর থম টিলিস ট্রাম্পের প্রধান অভ্যন্তরীণ নীতিগুলোর বিরোধিতা করায় তাঁকে তীব্র আক্রমণ করেন ট্রাম্প। এর পরিপ্রেক্ষিতে টিলিস রাজনীতি থেকে অবসরের ঘোষণা দেন। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ও সাবেক গভর্নর রয় কুপার সহজেই আসনটিতে জয় ছিনিয়ে নেন।
একইভাবে, টেক্সাসে দীর্ঘদিনের সফল রিপাবলিকান সিনেটর জন কর্নিনের বিরুদ্ধে বিতর্কিত অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটনকে সমর্থন দেন ট্রাম্প। ফলে প্রাইমারিতেই কর্নিনকে পরাজিত হতে হয়। এতে রিপাবলিকানদের অন্যতম শক্তিশালী এই অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্র্যাটদের জন্য জয়ের সুযোগ তৈরি হয়।
অন্যদিকে, সাউথ ক্যারোলিনার প্রবীণ রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের আকস্মিক মৃত্যুর পর তাঁর বোন ডারলিন গ্রাহামকে সমর্থন দেন ট্রাম্প। নির্বাচনে ডারলিনের কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকলেও অভিজ্ঞ প্রতিদ্বন্দ্বীদের বাদ দিয়ে তাঁকে সমর্থন দেওয়ার বিষয়টি সাধারণ সমর্থকেরা মেনে নেননি। ফলে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যানি অ্যান্ড্রুজ প্রায় ৪ শতাংশ ভোটের ব্যবধানে তাঁকে পরাজিত করে আসনটি ছিনিয়ে নেন।
বাংলাদেশ সময়: ১৪:৩৩:৩১ ১১ বার পঠিত #ডেমোক্রেটিক পার্টি #ডোনাল্ড ট্রাম্প #মধ্যবর্তী নির্বাচন #মার্কিন সিনেট নির্বাচন