
জামালপুর প্রতিনিধি : জামালপুরের ইসলামপুরে যমুনার দুর্গম চরাঞ্চলে নীরবে ঘটছে এক গভীর ট্র্যাজেডি। যে বয়সে শিশুদের বই হাতে স্বপ্ন দেখার কথা, সেই বয়সেই তারা হারাচ্ছে শিক্ষার নূন্যতম সুযোগ। যমুনার বুকে ভাসমান এই চরগুলোতে প্রতিদিন সূর্য উঠলেও পৌঁছাচ্ছে না শিক্ষার আলো। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে, নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকও আছেন; কিন্তু নেই শুধু পাঠদান আর ন্যূনতম দায়িত্ববোধ। কর্তৃপক্ষের চরম অবহেলায় চরাঞ্চলের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা এখন পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে।
দিঘাইড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চিত্র
উপজেলার সাপধরী ও বেলগাছা ইউনিয়নের বিদ্যালয়গুলো যেন কেবল শিক্ষকদের বেতন-ভাতা উত্তোলনের মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে দিঘাইড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবস্থা ভয়াবহ। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রধান শিক্ষক নুরুজ্জামান নিজের তৈরি করা নিয়মেই স্কুল চালান।
সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের বারান্দায় স্থানীয়রা গৃহস্থালি কাজ করছেন। শ্রেণিকক্ষ ব্যবহৃত হচ্ছে পেঁয়াজ রাখার গুদাম হিসেবে। কোনো শিক্ষক উপস্থিত নেই; নৈশপ্রহরী লিটন ৩ জন শিক্ষার্থীকে নিয়ে পাঠদান করার চেষ্টা করছেন।
এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষক নুরুজ্জামান দম্ভের সাথে জানান, “কাকে দিয়ে ক্লাস নেব বা নেব না সেটা আমার বিষয়, আপনারা বলার কে?” এদিকে নৈশপ্রহরী লিটন স্বীকার করেছেন যে, হেডস্যারের অনুমতিতেই তিনি ক্লাস নিচ্ছেন। এছাড়াও বছরের পর বছর তালাবদ্ধ চরবরুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
অন্যদিকে চরবরুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবনটি ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলেও সেখানে নেই কোনো প্রাণের স্পন্দন। মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর এভাবেই চলছে নামমাত্র কার্যক্রম। স্থানীয় অভিভাবকদের অভিযোগ, ”এই বিদ্যালয়ে শুধু পতাকা ওড়ে, পড়াশোনা হয় না। শিক্ষকরা মাঝে মাঝে এসে কিছুক্ষণ বসে থেকে নৌকায় করে চলে যান। বাধ্য হয়ে আমরা সন্তানদের নুরানি মাদ্রাসায় পাঠিয়ে দিচ্ছি।”
তদারকির অভাবে চরের শিশুদের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। চর মন্নিয়া এলাকার অভিভাবক মোঃ বক্কর মন্ডল বলেন, “শিক্ষকদের অবহেলায় এই চরে প্রাথমিক শিক্ষা কার্যত মৃত। এখনই ব্যবস্থা না নিলে এই শিশুরা অন্ধকারেই রয়ে যাবে।”
সাপধরী মন্ডল পাড়ার বাসিন্দা আরিফুর রহমান আক্ষেপ করে বলেন, শিক্ষকরা নিয়মিত আসেন না। যাও আসেন, কিছুক্ষণ বসে থেকে চলে যান। দেখার যেন কেউ নেই।
চরাঞ্চলের এই বেহাল দশা নিয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জাহানারা বেগম জানান, দ্রুতই বিদ্যালয়গুলো পরিদর্শন করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
চরাঞ্চলের এই হৃদয়বিদারক চিত্র বদলাতে শুধু পরিদর্শন নয়, প্রয়োজন কঠোর প্রশাসনিক নজরদারি। অন্যথায়, চরের হাজারো শিশুর স্বপ্ন যমুনার ঢেউয়ের সাথেই বিলীন হয়ে যাবে।
বাংলাদেশ সময়: ১১:৪৬:১১ ৯ বার পঠিত