
ফ্যাক্টচেকিংয়ের মাধ্যমে তথ্যের সত্যতা যাচাই-বাছাই করে জনগণের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতে গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবু আবদুল্লাহ এম ছালেহ (সালেহ শিবলী)।
তিনি বলেন, গুজব, গুঞ্জন ও অপপ্রচার রুখতে তথ্য যাচাইয়ের কোনো বিকল্প নেই। একই সঙ্গে অনিবন্ধিত অনলাইন পোর্টালগুলোর ভুল তথ্য থেকে জনগণকে সচেতন থাকার আহ্বান জানান তিনি।
আজ বৃহস্পতিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) নিয়মিত আয়োজন ‘মিট দ্য রিপোর্টার্স’-এ অতিথির বক্তব্যের পর সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ আহ্বান জানান।
ডিআরইউ’র শফিকুল কবির মিলনায়তনে এ অনুষ্ঠানে প্রেস সচিব বলেন, বর্তমানে অনলাইন পোর্টাল, পত্রপত্রিকা ও গণমাধ্যমের পাশাপাশি ব্যক্তিগত পর্যায়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে বিপুলসংখ্যক তথ্য ছড়িয়ে পড়ছে।
‘এসব তথ্য শুধু সরকারকে বিব্রত করছে বা সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করছে—বিষয়টি এমন নয়। বরং অনিবন্ধিত অনলাইনসহ বিভিন্ন মাধ্যমে অপপ্রচার, মিথ্যা তথ্য, গুজব, গুঞ্জন, মিসইনফরমেশন ও ডিসইনফরমেশন ছড়িয়ে পড়ায় সামাজিক স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর জন্য গণমাধ্যমকে তথ্যের সত্যতা যাচাই-বাছাই করে জনগণের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে জনগণের সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমার ধারণা, তিন মাস যদি এমন সচেতনতামূলক একটি অনুষ্ঠান কোনো একটি টেলিভিশনে চলে, কিংবা অন্তত সবগুলো টেলিভিশনে চলে, দেখবেন জনগণ এমনিতেই সচেতন হয়ে যাবে।
আর যারা মিসইনফরমেশন-ডিসইনফরমেশনের এই ব্যবসা খুলে বসেছেন, তারাও নিজেদের গুটিয়ে নেবেন।’
সাংবাদিকদের স্বার্থ ও অধিকার আদায়ের বিষয়ে প্রেস সচিব বলেন, এ বিষয়ে সাংবাদিকদের নিজেদেরই সোচ্চার হতে হবে।
তিনি বলেন, গণমাধ্যমের নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও দায়িত্বশীলতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। সাংবাদিকদের পেশাগত ও আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে সালেহ শিবলী বলেন, সরকার সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার পক্ষে। তবে স্বাধীনতার অর্থ যা ইচ্ছা তা লেখা নয়। স্বাধীনতা মানে হচ্ছে এটা নয় যে, যা ইচ্ছে আপনি তা লিখবেন।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সীমা সরকার, কোনো ব্যক্তি বা সাংবাদিক নির্ধারণ করবেন না; আইন ও বিধি অনুযায়ী আদালত সেই সীমারেখা নির্ধারণ করবে।
আসন্ন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে সালেহ শিবলী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে ভাষণ দিতে যাচ্ছেন। বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর এই অংশগ্রহণ দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
দেশের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিস্থিতি তুলে ধরে প্রেস সচিব বলেন, বিগত দিনের প্রশাসনিক কাঠামোর দুর্বলতা এবং চলমান বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি মোকাবিলা করে বর্তমান সরকার দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ঝুঁকি মোকাবিলা করে বাংলাদেশকে বিদেশি বিনিয়োগের জন্য নিরাপদ ও স্থিতিশীল রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার কাজ চলছে।
সালেহ শিবলী বলেন, সরকার সব নাগরিকের জন্য কাজ করার চেষ্টা করছে। সরকার সকলের হওয়ার প্রাণান্তকর চেষ্টা করছে।
সরকারের বিভিন্ন কল্যাণমুখী কর্মকাণ্ডের কথা তুলে ধরে সালেহ শিবলী বলেন, কৃষক কার্ড ও ফ্যামিলি কার্ডের মতো কর্মসূচি শুরু করা হয়েছে। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই যেসব কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ ছিল, তাদের সুদসহ সম্পূর্ণ ঋণ মওকুফ করে দেওয়া হয়েছে। এতে সারা দেশের প্রায় ১২ লাখের বেশি কৃষক সরাসরি উপকৃত হয়েছেন।
অনুষ্ঠানে হাম পরিস্থিতি নিয়ে প্রেস সচিব বলেন, শূন্য থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের একটি নির্দিষ্ট টিকা দেওয়ার কথা থাকলেও ফেব্রুয়ারিতে হাম ছড়িয়ে পড়ার সময় টিকার সংকট দেখা যায়। ফেব্রুয়ারিতে যখন হাম ছড়ানো শুরু করলো, তখন দেখা গেলো টিকা নেই। এর অর্থ হলো এর আগে পাঁচ বছর ঠিকমতো টিকা দেওয়া হয়নি।
হাম-রুবেলা টিকা নিয়ে সালেহ শিবলী বলেন, সাধারণত শূন্য থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের দুই মেয়াদে হাম-রুবেলার টিকা দেওয়ার কথা। কিন্তু বিগত সরকারগুলোর আমলে গত পাঁচ বছরে বহু শিশু টিকার আওতার বাইরে ছিল। ফলে মার্চ থেকে রোগটির প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে টিকার সংকট তৈরি হয়।
তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে শোকসন্তপ্ত মায়েদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন। সরকার অতীতের ওপর দায় চাপিয়ে বসে থাকেনি।’
‘এপ্রিল থেকে জরুরি ভিত্তিতে দেশের ৩৫টি জেলায় এবং পরবর্তীতে মে-জুন মাসে এক কোটির বেশি শিশুকে আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনিসেফের সহায়তায় টিকাদানের আওতায় আনা হয়েছে।’
প্রধানমন্ত্রীর নামের আগে ‘মাননীয়’ শব্দ ব্যবহারের বিষয়ে প্রেস সচিব বলেন, রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রীর পদমর্যাদাকে সম্মান জানানো আমাদের সংস্কৃতির অংশ। তবে সরকারি অফিসে প্রতিদিন শত শত ফাইলে স্বাক্ষর করার সময় নামের পাশে ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী’ লিখে উপস্থাপন করা যৌক্তিক নয়। এ কারণে সরকারি নথিতে এ ধরনের স্ব-সম্বোধনের প্রথা বন্ধ করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
শুধু রাজনীতি বা সরকারের দোষারোপের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোকে কর্মীদের সামাজিক সুরক্ষা ও যোগ্য সম্মান নিশ্চিত করার আহ্বান জানান প্রেস সচিব।
তিনি বলেন, প্রতিটি নাগরিকের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুরক্ষা দেওয়া কল্যাণ রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য এবং সরকার সে লক্ষ্যেই কাজ করছে।
অনুষ্ঠানে ডিআরইউ সভাপতি আবু সালেহ আকন, সহসভাপতি মেহেদী আজাদ মাসুম ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেলসহ সংগঠনটির নেতৃবৃন্দ ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকেরা উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশ সময়: ২৩:০৭:২২ ৩ বার পঠিত