আল-সায়েদের বিজয়ে কর্ণাটকে উল্লাস

প্রথম পাতা » আন্তর্জাতিক » আল-সায়েদের বিজয়ে কর্ণাটকে উল্লাস
বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬



আল-সায়েদের বিজয়ে কর্ণাটকে উল্লাস

যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান থেকে ভারতের কর্ণাটকের দূরত্ব প্রায় ১৪ হাজার কিলোমিটার। একটি জয় সেই দূরত্ব ঘুচিয়ে দিয়েছে নিমেষেই।
মঙ্গলবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে মিশিগান থেকে সিনেটর হিসেবে ঐতিহাসিক জয় পেয়েছেন আব্দুল আল-সায়েদ। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে তিনিই প্রথম মুসলমান সিনেটর। মিশিগানের বিজয়ে উল্লাসের ছোঁয়া লেগেছে ভারতের কর্ণাটকের ভাটকলেও। কারণ আল-সায়েদের স্ত্রী ডা. সারাহ জুকা কুর পরিবারের আদি নিবাস এই ভাটকলে।
‘কর্ণাটকের জামাইবাবু’র এই সাফল্যে সারাহর বৃহৎ পরিবারের তাই বইছে আনন্দের জোয়ার। এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানা যায়।

ভাটকলে পারিবারিক বিয়েতে এসে আত্মীয়দের সঙ্গে মেলামেশা করা আল-সায়েদ তাঁদের কাছে কেবল আমেরিকার গণমাধ্যমের শিরোনাম হওয়া কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নন। তিনি এমন একজন মানুষ, যাঁকে তাঁরা খুব কাছ থেকে চেনেন, যাঁর বিনয় তাঁদের মুগ্ধ করেছে এবং যাঁর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জনসেবার এক পারিবারিক ঐতিহ্য।

এনডিটিভি-র সঙ্গে আলাপকালে সারাহর মামাতো ভাই জুকা কু শামসুদ্দিন জিয়া এবং চাচাতো বোন বিবি হুসনা এই বিজয়কে এক অপার আনন্দ ও গর্বের মুহূর্ত হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ভাটকল থেকে বিবি হুসনা বলেন, ‘ভোট গণনা এবং নির্বাচনের প্রচারণার পুরোটা সময় আমরা সবাই চরম মানসিক চাপে ছিলাম। আমরা আমাদের চাচার (আল-সায়েদের শ্বশুর) সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছিলাম, যিনি আমাদের বলতেন যে তাঁরা প্রচারণায় ভীষণ ব্যস্ত। কিন্তু ঈশ্বরের অশেষ কৃপায় এটি একটি চমৎকার বিজয় এনে দিয়েছে।’

তবে তাঁদের এই উদযাপন ছিল মূলত ভার্চুয়াল।
আত্মীয়স্বজন পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকায় পরিবারের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপগুলোই হয়ে উঠেছিল অভিনন্দন বার্তা এবং সর্বশেষ আপডেট আদান-প্রদানের মূল কেন্দ্র। ফলাফল প্রকাশের পর হুসনা তাঁর চাচাকে ফোন করার মুহূর্তটি স্মরণ করে জানান, সে সময় চাচার বাড়িতে অনেক আত্মীয় ও অতিথি উপস্থিত ছিলেন এবং সেখানে উদযাপনের ধুম চলছিল। তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই সত্যিই ভীষণ আনন্দিত ও উচ্ছ্বসিত।’

কর্ণাটকের আত্মীয়দের কাছে আব্দুল আল-সায়েদের সঙ্গে ভাটকলের সংযোগ বেশ কয়েক বছরের পুরোনো। সারাহর বাবা ডা. তায়েব জুকা কু সবসময় তাঁর সন্তানদের এই উপকূলীয় শহরে নিয়ে আসতেন, যাতে তাঁরা নিজেদের শিকড় এবং দূরসম্পর্কের আত্মীয়দের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন। এক দশকেরও বেশি সময় আগে একটি পারিবারিক বিয়েতে অংশ নিতে আব্দুল ও সারাহ ভাটকলে এসেছিলেন এবং আত্মীয়দের সঙ্গে তিন-চার দিন সময় কাটিয়েছিলেন।

পরিবারের সদস্যরা আল-সায়েদকে একজন অত্যন্ত আন্তরিক, অমায়িক এবং আড্ডাপ্রিয় মানুষ হিসেবে স্মরণ করেন।
স্মৃতিচারণ করেন হুসনা বলেন, ‘তিনি অত্যন্ত বিনয়ী এবং ভালো মনের মানুষ। তাঁর সঙ্গে কথা বলাটা ছিল দারুণ আনন্দের, কারণ তাঁর যেমন গভীর জ্ঞান ও বোঝাপড়া রয়েছে, তেমনি তিনি অত্যন্ত সজ্জন এবং কখনো কাউকে ছোট করে কথা বলেন না।’

জিয়াও ভাটকলের খাবারের প্রতি আব্দুলের পছন্দের কথা স্মরণ করেন, বিশেষ করে এখানকার অনন্য বিরিয়ানি এবং স্থানীয় পদের কথা। তিনি এই অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী মরিচের পেস্ট ‘লোনমিরি’-র কথা উল্লেখ করেন, যা এখানকার খাবারে এক বিশেষ স্বাদ এনে দেয়।

বেঙ্গালুরুতে বসবাসরত জিয়ার কাছে এই রাজনৈতিক মাইলফলকটি তাঁর প্রয়াত দাদা জুকা কু শামসুদ্দিনের স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে, যিনি তৎকালীন মহীশূর রাজ্যের একজন মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি তাঁর দাদা এবং আব্দুলের মধ্যে এক আশ্চর্য মিল খুঁজে পান, বিশেষ করে জনসেবার প্রতি তাঁদের দায়বদ্ধতা এবং ব্যক্তিগত সততার জায়গায়। জিয়া বলেন, ‘আমার দাদা এবং আব্দুল আল-সায়েদের মধ্যে আমি দুটি বিষয়ে দারুণ মিল দেখতে পাই—তা হলো তাঁদের সততা ও পরিচ্ছন্ন ব্যক্তিত্ব, এবং সত্যের পক্ষে মানুষের সেবা করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। তাঁরা একদম সোজাসাপটা মানুষ, তাঁদের মধ্যে কোনো কপটতা বা দ্বিচারিতা নেই।’

জিয়া জানান, তাঁর দাদা সততা ও দুর্নীতিমুক্ত থেকে মানবতার সেবা করার নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি মনে করেন, সেই একই আদর্শ আব্দুলের রাজনৈতিক বার্তার মধ্যেও প্রতিফলিত হয়েছে।

এই পরিবারটি এই বিজয়কে কেবল একটি ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক অর্জন হিসেবে দেখছে না। হুসনা এটিকে ইসলামোফোবিয়া, উৎপীড়ন এবং অপপ্রচারের বিরুদ্ধে একটি বড় জয় হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে বিরাজমান ইসলামোফোবিয়ার মধ্যেও তিনি এক বিশাল সাফল্য নিয়ে বেরিয়ে এসেছেন। আমাদের কাছে এটি কেবল আব্দুলের জয় নয়, বরং এটি দুর্নীতি, দমনমূলক ক্ষমতা এবং নোংরা অপপ্রচারের বিরুদ্ধে এক বড় বিজয়।’

অন্যদিকে জিয়া আল-সায়েদের দেওয়া রাজনৈতিক স্লোগান যেমন—‘রাজনীতি থেকে টাকা দূর করো, নিজের পকেটে টাকা ভরো’ এবং ’সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা’-র কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এই আকাঙ্ক্ষাগুলো কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং ভারতের মতো দেশেও সাধারণ মানুষ এমন নেতাদের প্রত্যাশা করে যারা পরিচ্ছন্ন শাসন ও জনকল্যাণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। জিয়া বলেন, ‘আমরা ভারতেও এই যোগ্যতাসম্পন্ন, দুর্নীতিমুক্ত এবং মানবতার সেবায় নিবেদিতপ্রাণ নেতা পেতে চাই। আমরা এমন নেতৃত্বের জন্য উন্মুখ হয়ে আছি।’

তবে এই আনন্দের পাশাপাশি পরিবারের মনে এক ধরনের দায়িত্ব ও উদ্বেগের অনুভূতিও রয়েছে। হুসনা জানান, আব্দুলের নতুন পদ ঘিরে মানুষের যে বিপুল প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে সে সম্পর্কে পরিবার সচেতন এবং তাঁরা প্রার্থনা করছেন যেন তিনি তাঁর প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণ করতে পারেন এবং সুরক্ষিত থাকেন, ‘আমরা একই সঙ্গে তাঁর কাজ করার ক্ষমতা এবং তাঁর ও তাঁর পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে কিছুটা চিন্তিত।’

ভাটকলের এই বর্ধিত পরিবারের কাছে এই মুহূর্তটি তাঁদের দেশের বাড়িটিকে আন্তর্জাতিক মানচিত্রে তুলে ধরেছে। হুসনা যেভাবে বললেন, হাজার হাজার মাইল দূরের একটি বড় রাজনৈতিক বিজয় যখন দেশের বাড়ির সঙ্গে এতটা নিবিড়ভাবে যুক্ত থাকে, তখন আচমকাই পৃথিবীটাকে অনেক ছোট মনে হয়।

পরিবারটি এখন সামনের দিকে তাকিয়ে আছে এই আশায় যে, আব্দুলের রাজনৈতিক পথচলা তাঁর দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পরিবর্তন নিয়ে আসবে—এবং আমেরিকান রাজনীতির সঙ্গে ভাটকলের এই অপ্রত্যাশিত সংযোগটি সবসময় সঠিক ও সুন্দর কারণে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

বাংলাদেশ সময়: ২৩:৪৪:৩৮   ৩ বার পঠিত  







পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

আন্তর্জাতিক’র আরও খবর


আল-সায়েদের বিজয়ে কর্ণাটকে উল্লাস
নিউইয়র্ক সিনেটে প্রথম ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত নারী আবের কাওয়াস
মার্কিন সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার ডেমোক্র্যাটদের, বড় ধাক্কায় ট্রাম্প
ট্রাম্পের রিপাবলিকানদের ভরাডুবি, সিনেট এখন ডেমোক্র্যাটদের
ভেনেজুয়েলায় কলম্বীয় বিদ্রোহীদের ঘাঁটিতে সেনাবাহিনীর হামলা, নিহত ১৯
সোমবার থেকে ফ্রান্সে আবারও শুরু হচ্ছে হাই স্কুল অবরোধ : শিক্ষার্থী সংগঠন
ফিলিপাইনের মুসলিম-অধ্যুষিত অঞ্চলে প্রথম নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী
আরব পাঠ প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়ে সিজদায় লুটিয়ে পড়ল শিশু মায়ার
ইরানের শর্ত না মানলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা নয়: গালিবাফ
সৌদি আরবের যুদ্ধে কি সরাসরি জড়াবে পাকিস্তান?

News 2 Narayanganj News Archive

আর্কাইভ