শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬

সংবিধানের একক ক্ষমতার দুর্বলতা দূর করতেই জুলাই সনদ ও গণভোট - অধ্যাপক আলী রীয়াজ

প্রথম পাতা » ছবি গ্যালারী » সংবিধানের একক ক্ষমতার দুর্বলতা দূর করতেই জুলাই সনদ ও গণভোট - অধ্যাপক আলী রীয়াজ
শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬



সংবিধানের একক ক্ষমতার দুর্বলতা দূর করতেই জুলাই সনদ ও গণভোট - অধ্যাপক আলী রীয়াজ

প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেছেন, এক ব্যক্তির কাছে রাষ্ট্র সমর্পণের ব্যবস্থা বর্তমান সংবিধানেই আছে। এর সুযোগ নিয়েই স্বাধীনতার পর থেকে বার বার এক ব্যক্তির মর্জির কাছে দেশটা তুলে দেওয়া হয়েছিল। সংবিধানের এই দুর্বলতা দূর করার জন্যই জুলাই সনদ এবং গণভোটের আয়োজন করা হয়েছে। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলাপ আলোচনা করে জুলাই সনদ তৈরি করা হয়েছে, যেখানে সংবিধানে সুস্পষ্ট কিছু পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। এগুলো বাস্তবায়িত হলে ক্ষমতার ওপর একক ব্যক্তির কর্তৃত্ব থেকে আমরা বের হয়ে আসতে পারব।

আজ সিলেট বিভাগীয় ক্রীড়া কমপ্লেক্সে বিভাগীয় প্রশাসন ও ইসলামী ফাউন্ডেশন আয়োজিত গণভোটের প্রচার ও ভোটারদের উদ্বুদ্ধ করতে ইমাম সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী এসব কথা বলেন। সিলেট বিভাগের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত বারো শতাধিক ইমাম এই সম্মেলনে যোগ দেন।

এক ব্যক্তির হাতে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার উদাহরণ দিয়ে আলী রীয়াজ বলেন, বর্তমান ব্যবস্থায় যে কোনো ব্যক্তি, যিনি অধঃস্তন আদালত থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ আদালতে দণ্ডিত হয়েছেন, তাকে ইচ্ছা করলেই রাষ্ট্রপতি ক্ষমা করে দিতে পারেন। বিদ্যমান সংবিধানে এই ব্যবস্থা আছে এবং তার ভয়াবহ অপব্যবহার করা হয়েছে। এখানে রাষ্ট্রপতির ক্ষমা বলা হলেও আদতে তা প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছাতেই হয়। তিনি বলেন, এই ব্যবস্থা বন্ধ করতে জুলাই সনদে একটি কমিটি করার কথা বলা হয়েছে। উপরন্তু বিধান রাখা হয়েছে যে, ক্ষমা লাভের জন্য ক্ষতিগ্রস্তের পরিবারের সম্মতি ছাড়া রাষ্ট্রপতি কাউকে ক্ষমা করতে পারবেন না। এই বিধান বাস্তবায়ন করতে গণভোটে জনগণের সম্মতি প্রয়োজন এবং এর আর কোনো বিকল্প নেই বলে উল্লেখ করেন তিনি।

নির্বাচন ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করে আলী রীয়াজ বলেন, আমাদের সংবিধানে নির্বাচন কমিশন রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেবেন বলা হয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলোর তালিকা নেওয়া, সেই সাথে সার্চ কমিটির কথা বলা হয়েছে। তিনি বলেন, গত তিনটি নির্বাচন নিয়ে তদন্ত করে দেখা গেছে যে রাজনৈতিক দল নাম না দেওয়া সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রীর একক ইচ্ছায় নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ক্ষমতায় থাকার রাস্তা নিষ্কণ্টক করতে ভয়াবহ সব অনিয়ম করা হয়েছে। এমনকি দলীয় নেতারা শেখ হাসিনাকে আজীবনের প্রধানমন্ত্রী বানাতে চেয়েছে।

আলী রীয়াজ বলেন, এমন কিছু যেন ভবিষ্যতে আর কেউ করতে না পারে তা নিশ্চিতে রাজনৈতিক দলগুলো এক ব্যক্তির প্রধানমন্ত্রিত্বের মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছরে সীমিত করার জন্য একমত হয়েছেন। এখন জনগণ গণভোটে ‘হ্যাঁ’-তে রায় দিলে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।

গণভোট বিষয়ক প্রচার কার্যক্রমের মুখ্য সমন্বয়ক বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়িত হলে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের কারো কোনো ব্যক্তিগত লাভ হবে না। পরবর্তী যে সরকার দায়িত্ব নেবে তারাই জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করবে। এ কারণেই রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে দীর্ঘ নয় মাস আলোচনা করে তারপর জুলাই জাতীয় সনদ তৈরি করা হয়েছে। জুলাই সনদকে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে জনগণের সামাজিক চুক্তি উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমি বিশ্বাস করি, গণভোটে জনগণ ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে রায় দিলে কোনো রাজনৈতিক দল এই নৈতিক অবস্থান থেকে সরে আসবে না।

সংবিধানে বিসমিল্লাহ ও রাষ্ট্রধর্মের বিষয়ে আলী রীয়াজ বলেন, গণভোটে জনগণ সম্মতি দিলে সংবিধানে বিসমিল্লাহ, মহান আল্লাহর ওপর আস্থা ও রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম থাকবে না বলে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। তিনি বলেন, জুলাই সনদে রাষ্ট্র ব্যবস্থার যে ৮৪টি বিষয়ে পরিবর্তনের কথা হয়েছে তার কোনো স্থানেই এ রকম কোনো কথা বলা হয় নাই।

সভার বিশেষ অতিথি প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (ঐকমত্য) মনির হায়দার বলেন, শতকরা ৯০ শতাংশ মুসলমানের এই দেশে একটা সময় টুপি দাড়িওয়ালা মানুষকে সন্দেহের চোখে দেখা হতো। তাদেরকে সব সময় একটা আশঙ্কার মধ্যে দিয়ে জীবন কাটাতে হতো। এখন এই অবস্থার অবসান হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের সন্তান-ভাইয়েরা তাদের জীবন দিয়ে আমাদের মুক্তি দিয়েছে। তিনি বলেন, এবারের গণভোটের মূল প্রশ্ন হলো এই সকল শহিদের রক্তের সাথে আমরা বেইমানি করব না, তাদের রেখে যাওয়া দায়িত্বটি পালন করবো।

মনির হায়দার আরো বলেন, বহু বছর যাবৎ এদেশে ইসলাম ও মুক্তিযুদ্ধকে বারবার মুখোমুখি করা হয়েছে। অথচ আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ইনসাফের কথা বলা হয়েছিল যার কোনটাই ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক নয়। মুক্তিযুদ্ধের পর এই মূলনীতিগুলোর কোনটাই আমাদের সংবিধানে রাখা হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর মধ্য দিয়ে দেশকে একটা ভুল পথে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।

৫৪ বছর ধরে আমরা এই ভুলের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি উল্লেখ করে মনির হায়দার বলেন, এই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হলে আমরা আবার সঠিক পথের দিকে অগ্রসর হতে পারব।

সিলেট বিভাগীয় কমিশনার খান মোঃ রেজা-উন-নবীর সভাপতিত্বে সভায় বক্তব্য রাখেন সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি মোঃ মুশফেকুর রহমান, সিলেটের পুলিশ কমিশনার আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পরিচালক ড. সৈয়দ শাহ এমরান, জাতীয় ইমাম সমিতির সিলেট মহানগরের সভাপতি মাওলানা হাবীব আহমদ শিহাব ও সিলেট জেলা সভাপতি মাওলানা মোহাম্মদ এহসান উদ্দিন।।

বাংলাদেশ সময়: ২২:৩৪:৫৫   ৮ বার পঠিত