
সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছেন, ঈদের ছুটিকে কেন্দ্র করে সড়কে যানবাহনের চাপ বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে মহাসড়কে যানবাহন ও যাত্রীদের নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে সরকার সমন্বিত নজরদারি ও আইন প্রয়োগ কার্যক্রম আরো জোরদার করেছে।
তিনি বলেন, ঈদের সময় যানবাহনের চাপ অনেক বেড়ে যায়, আর দুর্ভাগ্যজনকভাবে কিছু ফিটনেসবিহীন যানও মহাসড়কে চলাচল করে, যা অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার কারণ হয়। আমরা বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সমন্বিত ও প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির মাধ্যমে মোকাবিলা করছি।
আজ রোববার সংসদে কুমিল্লা-৯ আসনের সরকারি দলের সংসদ সদস্য মো. আবুল কালামের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
মন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) সদর দপ্তরে একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে বিআরটিএ, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (আরএইচডি), বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি), ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ), ঢাকা বাস র্যাপিড ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড এবং ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড একসঙ্গে কাজ করছে।
তিনি বলেন, ‘এই নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে সিসিটিভি ও টেলিভিশন ফিডের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো হচ্ছে এবং দেশের গুরুত্বপূর্ণ মোড়, সংযোগস্থল ও যানজটপ্রবণ এলাকাগুলো পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।’
তিনি আরো বলেন, যানজট নিরসন ও সড়ক দুর্ঘটনায় দ্রুত সাড়া দিতে জেলা প্রশাসন ও পুলিশের সঙ্গে তাৎক্ষণিক সমন্বয় করা হচ্ছে। দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত যান সরিয়ে নেওয়া এবং আহতদের জন্য জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
মন্ত্রী জানান, ঈদের সময়ে ২৪ ঘণ্টা নজরদারি কার্যক্রম চালু রয়েছে এবং জেলা পর্যায়ে সড়ক নিরাপত্তা কমিটির সভা নিয়মিত অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
বিআরটিএ, পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করছে।
দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর জাতীয়, আঞ্চলিক ও জেলা সড়কগুলোকে নিরাপদ করতে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
তিনি বলেন, মহাসড়কগুলো চার লেনে উন্নীত করা হচ্ছে এবং ধীরগতির যানবাহন পৃথক রাখতে সার্ভিস লেন নির্মাণ করা হচ্ছে। ব্যস্ত মোড় ও রেলক্রসিংয়ে ওভারপাস, আন্ডারপাস ও রেলওয়ে ওভারপাস নির্মাণ করা হচ্ছে।’
মন্ত্রী আরো জানান, বিদ্যমান সড়ক ও চলমান প্রকল্পে নিরাপত্তা মান নিশ্চিত করতে নিয়মিত রোড সেফটি অডিট করা হচ্ছে। জ্যামিতিক নকশার কারিগরি যাচাই জোরদার করা হয়েছে এবং নকশা নির্দেশিকা হালনাগাদ করা হচ্ছে।
স্মার্ট প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়ে তিনি বলেন, কোরিয়ার সহায়তায় কোইকা’র মাধ্যমে জাতীয় মহাসড়কে ইন্টেলিজেন্ট ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম (আইটিএস) পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে যানবাহনের চলাচল রিয়েল-টাইমে পর্যবেক্ষণ করা যায়, ফলে অতিরিক্ত গতি, অবৈধ পার্কিং, যানজট ও দুর্ঘটনা দ্রুত শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়।
তিনি জানান, বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ৩৬০ মিলিয়ন ডলারের ‘বাংলাদেশ রোড সেফটি প্রোগ্রাম (বিআরএসপি)’ বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। এ কর্মসূচির আওতায় রোড সেফটি সেল, আধুনিক দুর্ঘটনা ডেটা সেন্টার, ডিজিটাল আইন প্রয়োগ ব্যবস্থা, যানবাহন পরিদর্শন কেন্দ্র, চালক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট এবং দুর্ঘটনা-পরবর্তী সেবা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে।
তিনি বলেন, টেকসই সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জনসচেতনতা, গবেষণা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক ব্যবহারকারীদের সুরক্ষায়, বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিল্পাঞ্চলের কাছে, ফুটওভারব্রিজ, উঁচু পথচারী পারাপার এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে বলেও জানান তিনি।
মন্ত্রী বলেন, মহাসড়ক পুলিশের তথ্য ও গবেষণার ভিত্তিতে চিহ্নিত দুর্ঘটনাপ্রবণ ‘ব্ল্যাক স্পট’গুলো পর্যায়ক্রমে উন্নয়ন করা হচ্ছে।
তিনি আরো জানান, ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-রংপুর ও ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের চারটি স্থানে— কুমিল্লা, হবিগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ ও মাগুরায় পণ্যবাহী যানবাহনের চালকদের জন্য আধুনিক বিশ্রামাগার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, এই বিশ্রামাগারগুলো চালকদের ক্লান্তি কমাতে সহায়তা করবে, ফলে দুর্ঘটনা হ্রাস পাবে।
এছাড়া অতিরিক্ত পণ্যবহন রোধে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এক্সেল লোড নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে, যা সড়কের ক্ষতি কমাবে এবং নিরাপত্তা বাড়াবে।
মন্ত্রী বলেন, সমন্বিত এসব উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের সকল নাগরিকের জন্য নিরাপদ, শৃঙ্খলাপূর্ণ ও কার্যকর সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা আমাদের লক্ষ্য।
বাংলাদেশ সময়: ১৭:১৫:২১ ৮ বার পঠিত