![]()
সদরপুর , (ফরিদপুর) প্রতিনিধি : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ শুরু হলে গ্রেপ্তার এড়াতে আত্মগোপনে ছিলেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বোয়ালমারী উপজেলা কমিটির ৭৯ নম্বর সদস্য ও বোয়ালমারী কাজী সিরাজুল ইসলাম মহিলা কলেজের ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মাদ মজনু মিয়া। ২০০৮ সালে অবসরে যাওয়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক শাহজাহান বিশ্বাসের নামপদবি ব্যবহৃত সীল-স্বাক্ষর করা ওই সনদটিতে তিনি অজ্ঞাত রোগে ভুগছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলা এবং ইংরেজি মিশ্রিত দুইটি ভিন্ন তারিখ লেখা রয়েছে চিকিৎসা সনদটিতে। ‘মেডিসিন’ বিভাগের চিকিৎসা সনদ ব্যবহার করলেও তার সাথে রোগের প্রমাণপত্র হিসাবে জমা দিয়েছেন চক্ষু পরীক্ষার কয়েকটি কাগজ। এমনকি যেই ছুটির দরখাস্তের সাথে এই সংযুক্তি দেওয়া হয়েছে সেটিতেই কোন তারিখের-ই উল্লেখ নেই।
চিকিৎসা সনদের প্যাডে উল্লেখিত ঢাকার মিরপুর-১ এর ১/ডি, ৩-৩৫ ‘বিসমিল্লাহ ফার্মেসি’ ঠিকানায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এই চিকিৎসা সনদটি তাদের দেওয়া নয়। এমনকি তারা আরোও বলেন, কোন অবসরপ্রাপ্ত মেডিকেল অফিসার কোন চিকিৎসা সনদ দিতে পারেন না।
কর্মস্থলে সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষকে না জানিয়ে ১ মাসেরও বেশি সময় অনুপস্থিত থাকলেও মজনু মিয়া ১৮ জানুয়ারি থেকে ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত ৯ দিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার একটি ছুটির দরখাস্ত কলেজে জমা দেন এবং বাকী হাজিরা খাতার ফাকা জায়গায় স্বাক্ষর জালিয়াতির আশ্রয় নেন বলে জানা গেছে।
অবাক করার বিষয় হল প্রায় এক মাসেরও বেশি সময় কলেজে অনুপস্থিত থাকাকালীন ওই সময়টিকে বৈধতা দিতে ৬ মাস পর গত ১ জুলাই মজনু মিয়া এই চিকিৎসা সনদ সহ তার ছুটির দরখাস্ত কলেজে জমা দেন। ঘটনার সত্যতা জানতে সংবাদকর্মীরা গত সোমবার ১৩ জুলাই ——— দিকে কলেজে গেলে তিনি তড়িঘড়ি করে ছুটির দরখাস্তে উল্লেখিত তারিখের আগে এবং পরে স্বক্ষর করে হাজিরা খাতার খালি ঘরগুলো পূরণ করেন বলে জানা যায়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মোহাম্মদ মজনু মিয়া কার্যক্রমনিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বোয়ালমারী উপজেলা বর্তমান কমিটির ৭৯ নম্বর সদস্য। সরকারি বেতনভুক্ত চাকুরিজীবি হয়েও তিনি উপজেলার বড়গা নামক বাজারে কীটনাশক ও সারের পরিবেশক এবং ওয়াপদা মোড়ে যমুনা ইলেকট্রনিক্সের পরিবেশকের ব্যবসা করছেন। যা সরকারি নীতিমালা অুনযায়ী কোন এমপিওভুক্ত শিক্ষক কোন আর্থিক সুবিধাভোগী ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত থাকতে পারবেন না।
১৯৯৭ সালে তৎকালিন আওয়ামী সরকার আমলে বিএ (পাশ কোর্স) থেকে পাশ করে প্রিলিমিনারি মাস্টার্স করে দলীয় প্রভাব খাটিয়ে এই প্রতিষ্ঠানে প্রভাষক হিসাবে যোগ দেন তৎকালিন ছাত্রলীগ নেতা মজনু মিয়া। চাকুরি জীবনের শুরু থেকেই কলেজের অর্পিত দায়িত্ব পালনের চেয়ে দলীয় সভা-সমাবেশ ও ব্যবসা-বাণিজ্যেই তিনি বেশি ব্যস্ত থাকেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। কলেজে নিয়মিত না আসলেও তিনি প্রভাব খাটিয়ে যে কোন একদিন এসে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে যেতেন এবং তার এ ধরনের কাজে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করেছেন দুর্নীতির দায়ে সাময়িক বরখাস্ত (৫ ই আগষ্ট পরবর্তী) কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ বাকশিস(একটি আওয়ামীপন্থী জাতীয় পর্যায়ের শিক্ষক সংগঠন) এর কেন্দ্রীয় কমিটির কোষাধ্যক্ষ মো. ফরিদ আহমেদ।
২০১৫-১৬ সালে মজনু মিয়ার বিরুদ্ধে কলেজের সাত লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠে। ওই ঘটনার তদন্ত করে সত্যতা পাওয়ার পর ওই টাকা কলেজ ফান্ডে ফেরতও দেন তিনি। এছাড়াও প্রভাব খাটিয়ে দলীয় কার্যে যেমন মুজিব শতবর্ষে অধ্যক্ষের কার্যালয়ে ১০২ পাউন্ড ওজনের বিশাল কেক কাটা, জেলা আওয়ামী লীগের নতুন কমিটিকে গাড়ি বহর নিয়ে সংবর্ধনা দেওয়া এবং পদ্মা সেতুর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিয়ে যোগদানের নামে কলেজের বিপুল অর্থ অপচয় করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এই চরম আর্থিক অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে তখন কলেজের আর্থিক সংকট এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, সাধারণ নন-এমপিও শিক্ষকদের বেতন-ভাতা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। এই আর্থিক সংকটের কারণে ২৭ এপ্রিল ২০২২ সালে চরম মানসিক ও অর্থনৈতিক দুশ্চিন্তায় পড়ে রনজিৎ কুমার মন্ডল নামে কলেজের এক শিক্ষক স্ট্রোক করেন যা সে সময় বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী এবং অর্থের প্রাচুর্যতা থাকায় তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে সাহস পায় না কলেজ কর্তৃপক্ষ। স্থানীয় প্রভাব খাটিয়ে তিনি এখনো কলেজে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করছেন। ফলে কলেজের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে একাধিক সূত্রে জানা যায়।
বাংলাদেশ সময়: ১৫:১৩:০৫ ৩৩ বার পঠিত