
ইতালির কিংবদন্তি ফুটবলার ফ্রাঙ্কো বারেসি আর নেই। ৬৬ বছর বয়সে বারেসির মৃত্যুর খবর আজ জানিয়েছে তাঁর সাবেক ক্লাব এসি মিলান।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিলানের বিবৃতিতে বলা হয়, ‘ফ্রাঙ্কো বারেসির প্রয়াণে অশ্রুসিক্ত মিলান। তাঁর আদর্শ ও সততা ক্লাবের ডিএনএতে চিরকাল খোদাই করা থাকবে, ঠিক যেমন অমর হয়ে আছে তাঁর ঐতিহ্যবাহী ৬ নম্বর জার্সিটি।’
ইতালির হয়ে ১৯৮২ বিশ্বকাপ জেতেন বারেসি। আশির ও নব্বইয়ের দশকে মিলানের হয়ে তিনটি ইউরোপিয়ান কাপ (চ্যাম্পিয়নস লিগ) ও ছয়টি ইতালিয়ান লিগ শিরোপাও জেতেন। বারেসি অনেকের চোখেই সর্বকালের অন্যতম সেরা ডিফেন্ডার।
বারেসির মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ প্রকাশ করেনি মিলান। ফুসফুসের টিউমার অপসারণের জন্য ২০২৫ সালের আগস্টে তাঁর একটি অস্ত্রোপচার হয়েছিল। এর কিছুদিন পরই তিনি বলেছিলেন, ‘সম্পূর্ণ শক্তি ফিরে পেতে আমার একটু সময় লাগবে।’
বারেসি ১৯৮২ বিশ্বকাপে মাঠে নামার সুযোগ না পেলেও ইতালি দলের সদস্য ছিলেন। প্রথম বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পান ঘরের মাঠে আয়োজিত ১৯৯০ আসরে। সুইপার কিংবা সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার হিসেবে মাঠ মাতানো কিংবদন্তি সেবার বিশ্বকাপে অলস্টার দলে নাম লেখান। ১৯৯৪ বিশ্বকাপে অধিনায়ক হিসেবে ইতালিকে ফাইনালে তুললেও টাইব্রেকারে গোল করতে পারেননি।
১৯৮০ ও ১৯৮৮ ইউরোয় ইতালি দলের প্রতিনিধিত্ব করেন বারেসি। তাঁর বড় ভাই জিউসেপ্পে বারেসিও ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে খেলেন ইতালি দলে। ১৯৮০ ইউরোয় দুই ভাই ইতালি দলের প্রতিনিধিত্ব করলেও ফ্রাঙ্কো বারেসি মাঠে নামার সুযোগ পাননি। বড় টুর্নামেন্টে ওই একবারই দুই ভাই ইতালি জাতীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করেন।
১৯৬০ সালের মে মাসে লোম্বার্দিতে জন্ম নেওয়া ফ্রাঙ্কিনো ‘ফ্রাঙ্কো’ বারেসি ১৯৭৪ সালে মিলানের বয়সভিত্তিক দলে যোগ দেন। ১৯৭৮ সালে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই পা রাখেন ক্লাবের মূল দলে। এই মিলানেই ধীরে ধীরে কিংবদন্তি হয়ে ওঠেন বারেসি।
১৮ বছর বয়সেই মিলানের নিয়মিত মুখ হয়ে ওঠা বারেসি ২২ বছর বয়সে হন ক্লাবটির অধিনায়ক। নিজের চমৎকার টেকনিক, প্রতিপক্ষের খেলা আগেভাগে বোঝার ক্ষমতা ও নিখুঁত ট্যাকলিংয়ের পাশাপাশি নেতৃত্বের অসাধারণ গুণের জন্য দ্রুতই সবার নজর কাড়েন। মিলানে শুরুতে তাঁকে ডাকা হতো ‘পিসকিনিন’ (লিটল ওয়ান)। পরে সুইপার পজিশনে কিংবদন্তি হয়ে ওঠায় জার্মানির ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ারের সঙ্গে মিল রেখে তাঁকে ডাকা হতো ‘কাইজার ফ্রাঞ্জ।’
মিলানে পরবর্তী সময়ে পাওলো মালদিনি, মাউরো তাসোত্তি ও আলেসান্দ্রো কোস্তাকুর্তাকে নিয়ে যেকোনো স্ট্রাইকারের জন্য আতঙ্কের এক রক্ষণভাগ গড়ে তুলেছিলেন বারেসি।
মিলানের হয়ে ৭১৯টি ম্যাচ খেলে ১৯৯৭ সালে অবসর নেন কিংবদন্তি। ক্লাবের ইতিহাসে তাঁর চেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার রেকর্ড রয়েছে শুধু পাওলো মালদিনির।
ইতালির জার্সিতে ১২ বছরের ক্যারিয়ারে ৮১ ম্যাচে ১ গোল করেন বারেসি। তবে ১৯৮২ সালে বেঞ্চে বসে বিশ্বকাপ জয়ের পর জাতীয় দলের কোচের সঙ্গে মতভেদের কারণে ১৯৮৬ সালে মেক্সিকো বিশ্বকাপে দলে জায়গা পাননি। ১৯৯০ বিশ্বকাপে সেমিফাইনাল পর্যন্ত যেতে পেরেছিলেন। বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন, রানার্স আপ ও তৃতীয় হওয়া সাতজন ফুটবলারের একজন কিংবদন্তি।
ইতালিয়ান ফুটবলে আশি–নব্বইয়ের দশকে বারেসি সবচেয়ে বড় তারকাদের একজন। মালদিনির মতো কিংবদন্তি থাকতেও কেউ কেউ বারেসিকেই মিলানের ইতিহাসে সেরা ডিফেন্ডার হিসেবে বিবেচনা করেন। মিলানকে তিনি এতই ভালোবাসতেন যে আর কোনো ক্লাবে যোগ দেননি। এই ক্লাবেই কাটিয়েছেন ক্যারিয়ারের ২০ বছর।
১৯৯৭ সালে অবসর নেওয়ার আগে ১৫ মৌসুম অধিনায়কত্ব করেন মিলানের। ছোট–বড় মিলিয়ে এই ক্লাবের হয়ে ১৯টি শিরোপা জেতেন। খেলোয়াড়ি জীবনের ইতি টানার পর বারেসির সম্মানে তাঁর ৬ নম্বর জার্সিটি চিরতরে তুলে রাখার ঘোষণা দেয় মিলান। ক্লাবটির ইতিহাসে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে এই বিরল সম্মান লাভ করেন বারেসি।
হাঁটুর অস্ত্রোপচারের মাত্র ২৫ দিন পর ১৯৯৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে ১২০ মিনিটের পুরোটা সময় বারেসির অসাধারণ খেলার গল্প এখন ফুটবলে রূপকথার অংশ। তবে ফুটবলের মাঠে বারেসি জীবনের সেরা সব গল্প লিখে গেছেন ‘রোজনেরি’দের লাল–কালো জার্সিতে।
বারেসি শুরু থেকেই মিলানের প্রতি নিখাদ আনুগত্যের প্রমাণ দিয়েছিলেন। আশির দশকের শুরুতে ক্লাবটি যখন দুবার সিরি ‘বি’-তে নেমে গিয়েছিল, তখনো তিনি দল ছাড়েননি; বরং দুবারই দলকে ইতালির শীর্ষ লিগে ফেরানোয় মূল ভূমিকা পালন করেন।
প্রায় দুই দশক ধরে মিলান ও ইতালির রক্ষণভাগের মূল স্তম্ভ ছিলেন বারেসি। ক্লাবটির ইতিহাসে সবচেয়ে সফল সময়ে তিনি অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন।
দৈহিক শক্তির ওপর নির্ভর করা সেই যুগের বাকি ডিফেন্ডারদের চেয়ে বারেসি ছিলেন সম্পূর্ণ আলাদা। প্রতিপক্ষের খেলা পড়ার অদ্ভুত এক ক্ষমতা ছিল তাঁর। রক্ষণ সামলানোর পাশাপাশি মাঝমাঠে বা আক্রমণে গতি এনে ‘সুইপার’ পজিশনের সংজ্ঞাই বদলে দিয়েছিলেন।
পাওলো মালদিনি, আলেসান্দ্রো কোস্তাকুর্তা ও মাউরো তাসোত্তিকে নিয়ে তৈরি এসি মিলানের বিখ্যাত সেই রক্ষণভাগকে পরিচালনা করতেন বারেসি নিজেই। তাঁদের নিখুঁত অফসাইড ট্র্যাপ ও কৌশলের ওপর ভর করে সিরি ‘আ’-তে টানা ৫৮ ম্যাচ অপরাজিত থাকার অবিশ্বাস্য রেকর্ড গড়েছিল মিলান, যা ফাবিও কাপেলোর সেই দলকে ‘গ্লি ইনভিন্সিবিলি’ (দ্য ইনভিন্সিবলস বা অপরাজিত দল) নামে অমরত্ব এনে দেয়।
বাংলাদেশ সময়: ১৬:৫৪:৩৭ ৩ বার পঠিত