![]()
নিজস্ব প্রতিবেদক: নারায়ণগঞ্জের প্রথম সারির ব্যবসায়ী মোহাম্মদ সোহাগ দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দেশ ও সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। নারায়ণগঞ্জসহ দেশের ব্যবসায়ী মহলে তার পরিচিতি রয়েছে। তবে বর্তমানে নিজের ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন তিনি। নিরাপত্তার জন্য প্রশাসনের সহযোগিতা চেয়ে একাধিকবার উদ্যোগ নেওয়ার পরও এ বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। এ অবস্থায় ব্যবসায়ী, পরিবহন ও শুভাকাঙ্ক্ষী মহলের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। সচেতন মহলের দাবি, ব্যবসায়ী মোহাম্মদ সোহাগের নিরাপত্তায় প্রশাসনের দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
কয়েকজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ব্যবসায়ী মোহাম্মদ সোহাগকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও বিষয়টি নিয়ে তাদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। তারা প্রশ্ন তুলেছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কেন আরও শক্তিশালী পদক্ষেপ নিচ্ছে না এবং এর অন্তরায় কোথায়। তাদের মতে, দ্রুত সময়ের মধ্যে ব্যবসায়ী মোহাম্মদ সোহাগের সহযোগিতা প্রয়োজন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে। ইতোমধ্যে মোহাম্মদ সোহাগের অপহরণ মামলার তদন্ত শেষে আদালতে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। সাতজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র গ্রহণ করেছেন আদালত এবং তিনজনকে অব্যাহতির সুপারিশ করেছে তদন্তকারী সংস্থা। তবে অভিযোগপত্র গ্রহণের পরও ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী নেতা মোহাম্মদ সোহাগ ও তার পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মামলা প্রত্যাহারের জন্য হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগের পাশাপাশি চার্জশিটভুক্ত কয়েকজনের প্রকাশ্যে চলাফেরার দাবিও বিভিন্ন প্রতিবেদনে সামনে এসেছে।
সর্বশেষ নিজের জীবন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তার কথা উল্লেখ করে থানায় জমা রাখা বৈধ লাইসেন্সকৃত পিস্তল ও শর্টগানসহ গোলাবারুদ ফেরত চেয়ে নারায়ণগঞ্জের জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আবেদন করেছেন সোহাগ।
মামলার নথি ও প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ জুন রাতে ব্যবসায়িক কাজ শেষে বাসায় ফেরার পথে নারায়ণগঞ্জের সরকারি তোলারাম কলেজের সামনে থেকে মোহাম্মদ সোহাগকে একটি গাড়িতে তুলে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। পরে তাকে নারায়ণগঞ্জ থেকে পটুয়াখালীর দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। পরদিন ২ জুন পটুয়াখালীর পায়রা বন্দর এলাকার একটি ফেরিঘাটের কাছ থেকে তাকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় উদ্ধার করা হয় বলে মামলাসংক্রান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ঘটনায় সোহাগের স্ত্রী তানিয়া আহাম্মেদ বাদী হয়ে ফতুল্লা মডেল থানায় মামলা করেন। মামলাটি ১২(০৬)২৫ নম্বরে এবং দণ্ডবিধির ৩৬৪/৩৪ ধারায় করা হয়। দীর্ঘ তদন্তের পর পুলিশ সাতজনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ না পাওয়ার কথা উল্লেখ করে আরও তিনজনকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়। গত ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা আমলি চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত অভিযোগপত্রটি গ্রহণ করেন। অভিযোগপত্রের নম্বর ৩১৮। চার্জশিটভুক্ত ব্যক্তিরা হলেন—মো. আল আমিন শেখ ওরফে জিতু, মো. কবির হালদার, লতিফ সিদ্দিকী রতন, সাব্বির আহমেদ, ইরান হোসেন মোহন, মো. সাকিব হোসেন ও মো. ছাহাদ। প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, তদন্তের সময় সাক্ষীদের বক্তব্য, মোবাইল ফোনের যোগাযোগ, ডিজিটাল তথ্য, বিভিন্ন আলামত ও অপহরণে ব্যবহৃত যানবাহনসহ বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করা হয়েছে। কয়েকজন আসামির আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারার জবানবন্দির কথাও চার্জশিট-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। তবে চার্জশিটে কার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ রয়েছে এবং সেই অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা কী, তা এখনো বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হয়নি। ২০২৬ সালের জুনে অপহরণের এক বছর পূর্তিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মামলার প্রধান আসামি হিসেবে উল্লেখ করা আল আমিন ওরফে জিতুসহ কয়েকজন তখনও গ্রেপ্তারের বাইরে ছিলেন। একই প্রতিবেদনে কয়েকজন আসামির জামিনে বের হয়ে আত্মগোপনে থাকার কথাও উল্লেখ করা হয়।
ব্যবসায়ী মোহাম্মদ সোহাগের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিভিন্ন অজ্ঞাতনামা নম্বর থেকে তাকে ও তার স্ত্রীকে ভয়ভীতি দেখানো এবং মামলা তুলে নেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়েছে। ব্যবসায়িক ছবি সম্পাদনা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকির কথাও ওই জিডিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে মামলা প্রত্যাহারের জন্য প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগে লতিফ সিদ্দিকী রতন ও সাব্বির নামে দুজনকে গ্রেপ্তারের খবরও প্রকাশিত হয়েছিল। তবে এসব অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা আদালত বা পৃথক তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়ার বিষয়। আলোচনায় এসেছে আরও একটি বিষয় চার্জশিটভুক্ত কয়েকজন আসামি প্রকাশ্যে চলাফেরা করছেন বলে ভুক্তভোগী পক্ষ ও স্থানীয় সূত্রের দাবি।
এমন অভিযোগ সামনে আসায় প্রশ্ন উঠেছে, একজন অপহরণ মামলার ভুক্তভোগী ও বাদীপক্ষ যখন নিরাপত্তাহীনতার কথা জানাচ্ছেন, তখন মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রকাশ্য চলাফেরার বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা কী। এ নিয়েও নারায়ণগঞ্জের পাড়া-মহল্লার মানুষের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে।
জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দেওয়া আবেদনে মোহাম্মদ সোহাগ জানিয়েছেন, তার নামে একটি .৩২ বোর এনপিবি পিস্তল এবং একটি শর্টগানের লাইসেন্স রয়েছে। সরকারি নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ৩১ আগস্ট অস্ত্র দুটি ও সংশ্লিষ্ট গোলাবারুদ ফতুল্লা মডেল থানায় জমা দেওয়া হয়েছিল।
এরপর নিজের ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে একাধিকবার অস্ত্র ফেরত পাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৬ সালের ১৪ মার্চ নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতির মাধ্যমেও জেলা প্রশাসনের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছিল। সর্বশেষ ২০ সেপ্টেম্বর জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আবার আবেদন করা হয়।
অর্থাৎ, একজন ব্যবসায়ী নেতাকে অপহরণের অভিযোগের পর মামলার তদন্ত শেষ হয়েছে এবং চার্জশিট আদালতে গৃহীত হয়েছে; কিন্তু নিরাপত্তার প্রশ্নে ভুক্তভোগী এখন নিজের নামে বৈধভাবে লাইসেন্স করা অস্ত্র ফেরত পাওয়ার আবেদন করছেন।
মোহাম্মদ সোহাগ নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক এবং মীম শরৎ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের সঙ্গেও তিনি যুক্ত।
ব্যবসায়ী নেতারা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলছেন, একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী যদি অপহরণের শিকার হন এবং পরে মামলা করার কারণে হুমকির অভিযোগ তোলেন, তাহলে সাধারণ ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের নিরাপত্তা নিয়েও স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হয়।
বাংলাদেশ সময়: ১৪:৩৩:৪১ ৩৩ বার পঠিত