![]()
সদরপুর (ফরিদপুর) প্রতিনিধি : ফরিদপুরের নগরকান্দায় সার ডিলারশিপ নিয়োগকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে মারামারির ঘটনায় চারজন আহত হয়েছেন।
ডিলারশিপবঞ্চিত আবেদনকারীদের সংবাদ সম্মেলনের পর এলাকায় পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ও উত্তেজনার মধ্যে এ ঘটনা ঘটে।
আহতদের উদ্ধার করে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
সোমবার (১২ অক্টোবর) সন্ধ্যায় উপজেলার রামনগর ইউনিয়নের বাঙ্গাবাড়িয়া বাজারে এ ঘটনা ঘটে।
আহতরা হলেন দুলারডাঙ্গী গ্রামের শেখ খোরশেদ আহমেদ দোলন (৫০), উত্তর গোপীনাথপুর গ্রামের সুমন তালুকদার (৩৬), গোপালপুর গ্রামের ওয়াজেদ মোল্যা (৫০) ও বাড়ৈইডাঙ্গী গ্রামের মোস্তাক আহমেদ কলি মণ্ডল (৫০)। তাঁদের মধ্যে দোলন নিজেকে জেলা যুবদলের সদস্য দাবি করলেও তাঁর সাংগঠনিক পরিচয় স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
আহত দোলনের বড় ভাই শেখ ফরিদ আহমেদ মিলনের অভিযোগ, সার ডিলার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ায় তাঁর ভাইয়ের ওপর হামলা চালানো হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘সোমবার সন্ধ্যায় বাঙ্গাবাড়িয়া বাজারের একটি চায়ের দোকানে বসে ছিল দোলন। এ সময় তুষার মণ্ডলের নেতৃত্বে ২০ থেকে ২৫ জন হাতুড়ি ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তার ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। তাঁকে বাঁচাতে এগিয়ে গেলে আরও তিনজনকে পিটিয়ে আহত করা হয়।’
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ডিলারশিপ নিয়োগে অনিয়মের প্রতিবাদ করায় তাঁর ভাইকে হত্যার উদ্দেশ্যে মারধর করা হয়েছে। এতে দোলনের মাথায় গুরুতর আঘাত লেগেছে বলে দাবি করেন তিনি।
তবে হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মেসার্স এসএস এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী শিবলী সাদিক ওরফে তুষার মণ্ডল।
তিনি বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। আমি কিংবা আমার কোনো লোক এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত নই। আমাকে রাজনৈতিকভাবে ফাঁসানোর উদ্দেশ্যে এসব অভিযোগ তোলা হচ্ছে।’
তুষার মণ্ডল পাল্টা দাবি করেন, দোলন এলাকায় বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে অশোভন আচরণ ও গালিগালাজ করেছেন বলে তিনি শুনেছেন। এসব কারণে অন্যদের সঙ্গে বিরোধ থেকে মারামারির ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। তবে ঘটনার সঙ্গে নিজের বা তাঁর অনুসারীদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করেন তিনি।
এ বিষয়ে নগরকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাসুল সামদানী আজাদ বলেন, ‘দুই পক্ষের মধ্যে মারামারির খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে হাতুড়ি দিয়ে পেটানোর বিষয়টি এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ ঘটনায় অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
যেভাবে বিরোধের সূত্রপাত:
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি নগরকান্দা উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে সার ডিলার নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। রামনগর ইউনিয়নে ডিলারশিপের জন্য আবেদন করেন শেখ খোরশেদ আহমেদ দোলন ও একই ইউনিয়নের বিএনপি নেতা মান্নান মণ্ডলের ছেলে শিবলী সাদিক ওরফে তুষার মণ্ডল (৩০)।
নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষে মেসার্স এসএস এন্টারপ্রাইজের নামে ডিলারশিপ পান তুষার মণ্ডল।
এরপর ডিলারশিপ না পাওয়া দোলনসহ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের বঞ্চিত আবেদনকারীরা নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তোলেন।
এরই ধারাবাহিকতায় রোববার (১১ অক্টোবর) সকালে নগরকান্দা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন ডিলারশিপবঞ্চিত আবেদনকারীরা। এতে অর্ধশতাধিক আবেদনকারী অংশ নেন বলে আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়।
তাঁদের পক্ষে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন শাহীন মুন্সী। সংবাদ সম্মেলনে দোলনও উপস্থিত ছিলেন।
লিখিত বক্তব্যে অভিযোগ করা হয়, সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও শর্ত পূরণ করেও অনেক আবেদনকারী ডিলারশিপ পাননি। অন্যদিকে রাজনৈতিক পরিচয়, প্রভাবশালীদের সুপারিশ ও অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে কয়েকটি ইউনিয়নে ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তাঁরা।
তবে সংবাদ সম্মেলনে অর্থ লেনদেনের অভিযোগের পক্ষে কোনো দালিলিক প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। অভিযোগগুলোর সত্যতাও স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
অভিযোগকারীরা দাবি করেন, ফরিদপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম ডিলার নিয়োগের জন্য নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির নাম সুপারিশ করেননি। বরং সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী যোগ্য আবেদনকারীদের নির্বাচনের নির্দেশনা দিয়েছিলেন। তবে তাঁদের এ বক্তব্যের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা যায়নি।
সংবাদ সম্মেলনে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা আফরিন, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রেজাউল করিম এবং উপজেলা বিএনপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও লস্করদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান বাবুল তালুকদারের বিরুদ্ধে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়।
এ ছাড়া উপজেলার কাইচাইল, ডাঙ্গী, লস্করদিয়া, রামনগর ও ফুলসুতি ইউনিয়নে ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি বলে দাবি করেন আবেদনকারীরা। কয়েকজন নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তির নিজস্ব গোডাউন না থাকা এবং ভাড়া করা ঘর ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তাঁরা।
তবে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ অস্বীকার করেছে উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ।
নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেজওয়ানা আফরিন বলেন, ‘আমরা প্রতিটি ইউনিয়ন থেকে তিনজন করে যোগ্য প্রার্থীর নাম পাঠিয়েছি। মন্ত্রণালয় যাঁদের যোগ্য মনে করেছে, তাঁদের নিয়োগ দিয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘অভিযোগকারীরা বলছেন, বিএনপির ত্যাগী নেতাকর্মীদের বাদ দিয়ে ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু নীতিমালায় কোথাও বলা নেই যে বিএনপির লোকদেরই নিয়োগ দিতে হবে।’
অর্থ লেনদেনের অভিযোগ প্রসঙ্গে ইউএনও বলেন, ‘অভিযোগ করা সহজ। তাঁরা আমাদের বিরুদ্ধে টাকা-পয়সার বিনিময়ে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। তাঁদের কাছে তথ্য-প্রমাণ থাকলে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।’
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রেজাউল করিম বলেন, ‘কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তির পর চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটির সভাপতি ছিলেন ইউএনও মহোদয় এবং আমি ছিলাম সদস্যসচিব। যাচাই-বাছাই শেষে যোগ্য প্রার্থীদের তালিকা পাঠানো হয়েছে। এখানে আমাদের অনিয়ম করার কোনো সুযোগ নেই।’
অন্যদিকে, অভিযোগ অস্বীকার করে উপজেলা বিএনপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও লস্করদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান বাবুল তালুকদার বলেন, ‘এই নিয়োগ কমিটি বা নিয়োগপ্রক্রিয়ার সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। যাঁরা অভিযোগ করছেন, তাঁরা হয়তো না বুঝে করছেন, অথবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমার সম্মান ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘যতটুকু শুনেছি, যাঁরা নিয়োগ পেয়েছেন, তাঁদের ৯৯ শতাংশ বিএনপির লোক। দু-একজনকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি না।’
এদিকে সার ডিলার নিয়োগপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রার্থী বাছাইয়ের মানদণ্ড প্রকাশ এবং অনিয়মের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন বঞ্চিত আবেদনকারীরা।
বাংলাদেশ সময়: ১৬:৩০:০৮ ৩৫ বার পঠিত