
কক্সবাজারের রামুতে প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে বর্ণিল ফানুস উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছে। রবিবার (২৫ অক্টোবর) সন্ধ্যায় হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে রামুর আকাশ ছেয়ে যায় রঙিন ফানুসে।
ফানুসের আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে চারপাশ। উৎসবের রঙিন আয়োজনে উঠে আসে শান্তি, মানবতা, সম্প্রীতি ও কল্যাণের বার্তা।
রামুর কেন্দ্রীয় সীমা মহাবিহার ও সাদা চিংয়ের সামনের মাঠে অনুষ্ঠিত হয় জেলার অন্যতম বৃহৎ ফানুস উৎসব। সন্ধ্যা নামতেই নানা রঙের ফানুস নিয়ে সমবেত হন বৌদ্ধধর্মাবলম্বীরা।
একে একে আকাশে ওড়ানো হয় অসংখ্য ফানুস। কিছু ফানুসে তুলে ধরা হয় বুদ্ধের জীবনের নানা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কোথাও ফুটে ওঠে গৌতম বুদ্ধের জীবনদর্শন, কোথাও লেখা থাকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও বিশ্বশান্তির বার্তা।
ফানুসে বুদ্ধের জীবন ও সম্প্রীতির বার্তা
সীমা মহাবিহার থেকে ওড়ানো বিশেষ কিছু ফানুসে চিত্রায়িত হয় গৌতম বুদ্ধের জীবনের বিভিন্ন অধ্যায়।
সিদ্ধার্থের নগর ভ্রমণ, চারি নিমিত্ত দর্শন, গৃহত্যাগ, কেশরাশি ত্যাগ, কঠোর তপস্যা ও বোধিলাভের দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা হয় এসব ফানুসে।
কিছু ফানুসে লেখা ছিল ‘সাম্প্রদায়িকতা দূর হোক, সম্প্রীতি বেঁচে থাক’, ‘ফানুসের আলোয় আমাদের ভেতরের অন্ধকার দূর হোক’ এবং ‘জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক’। এসব বার্তার মধ্য দিয়ে শান্তিপূর্ণ ও মানবিক সমাজ গঠনের আহ্বান জানানো হয়। কয়েকটি ফানুসে স্থান পায় রামু সীমা মহাবিহারের প্রয়াত অধ্যক্ষ পণ্ডিত সত্যপ্রিয় মহাথেরের প্রতিকৃতিও।
রামু সীমা মহাবিহারের সহকারী পরিচালক ও কক্সবাজার জেলা বৌদ্ধ সুরক্ষা পরিষদের সভাপতি প্রজ্ঞানন্দ মহাথের বলেন, ‘প্রবারণা পূর্ণিমা বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিন।
আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা পর্যন্ত তিন মাসের বর্ষাবাস শেষে এদিন ভিক্ষুরা আত্মসমালোচনা ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে নতুন প্রতিজ্ঞায় ব্রতী হন। এটি সংযম, পরিশুদ্ধতা ও কল্যাণের উৎসব।’
তিনি আরো বলেন, ‘ফানুস ওড়ানো প্রবারণা পূর্ণিমার অন্যতম অনুষঙ্গ। বৌদ্ধ বিশ্বাস অনুযায়ী, ফানুসের আলো অন্ধকার দূর করে শান্তি, কল্যাণ ও আলোকিত জীবনের প্রতীক। ফানুস উড়িয়ে মানুষ নিজের, সমাজের ও বিশ্বের মঙ্গল কামনা করেন।’
বর্ষাবাস শেষে ধর্মীয় উৎসব
প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে সকাল থেকেই রামুর বিভিন্ন বৌদ্ধবিহারে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান শুরু হয়। বুদ্ধপূজা, অষ্টশীল গ্রহণ, মহাসংঘদান ও ধর্মসভার আয়োজন করা হয়। রামুর ঐতিহাসিক রাংকূট বনাশ্রম বৌদ্ধবিহার, মৈত্রী বৌদ্ধবিহার, কক্সবাজার শহরের অগ্গমেধা বৌদ্ধবিহারসহ টেকনাফ, উখিয়া, মহেশখালী, চকরিয়া ও কক্সবাজার সদর উপজেলার বিভিন্ন বৌদ্ধবিহারে উৎসবটি উদ্যাপিত হয়।
পূর্বরাজারকুলের সমাজকর্মী রতন বড়ুয়া বলেন, ‘প্রবারণা পূর্ণিমা আত্মশুদ্ধি, সংযম ও কল্যাণের বার্তা বহন করে। বর্ষাবাস শেষে এ উৎসব উপলক্ষে রামুতে ফানুস উত্তোলন ও জাহাজ ভাসানোর আয়োজন করা হয়। ধর্মীয় ঐতিহ্যের পাশাপাশি এসব আয়োজন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও রামুর সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।’
রামুর সাংবাদিক ও কেন্দ্রীয় প্রবারণা ও জাহাজ ভাসা উৎসব উদ্যাপন পরিষদের প্রধান সমন্বয়কারী অর্পন বড়ুয়া বলেন, ‘সম্প্রীতির জাহাজে, ফানুসের আলোয় দূর হোক সাম্প্রদায়িক অন্ধকার। প্রবারণা মানে শান্তি, সহমর্মিতা ও মানবতার জয়গান। পৃথিবীর সব যুদ্ধ, নিপীড়ন ও অন্যায়ের অবসান হোক এটাই আমাদের প্রত্যাশা।’
বাঁকখালী নদীতে ভাসবে কল্পজাহাজ
প্রবারণা পূর্ণিমার আনুষ্ঠানিকতা শেষে সোমবার (২৬ অক্টোবর) দুপুরে রামুর বাঁকখালী নদীতে অনুষ্ঠিত হবে ঐতিহ্যবাহী কল্পজাহাজ ভাসানোর উৎসব। এ আয়োজন ঘিরে স্থানীয় বাসিন্দা ও দর্শনার্থীদের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা বিরাজ করছে।
রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিল্লুর রহমান বলেন, ‘প্রবারণা পূর্ণিমা শান্তি, সম্প্রীতি ও মানবতার বার্তা দেয়। রামু সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য জনপদ। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই মিলেমিশে উৎসব উদ্যাপন করুক এটাই আমাদের প্রত্যাশা।’
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, ‘কক্সবাজার সম্প্রীতি ও মৈত্রীর শহর। এখানে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষ মিলেমিশে বসবাস করেন এবং একে অপরের ধর্মীয় উৎসবে অংশ নেন। বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে আয়োজিত ফানুস উৎসবও সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের অনন্য দৃষ্টান্ত। সব ধর্মের মানুষের ধর্মীয় উৎসব নির্বিঘ্নে উদ্যাপন নিশ্চিত করতে সরকার ও প্রশাসন প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে।’
ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, বর্ণিল ফানুস আর কল্পজাহাজ ভাসানোর মধ্য দিয়ে রামুতে প্রবারণা পূর্ণিমা কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং সম্প্রীতি, সহাবস্থান ও মানবিক মূল্যবোধের বার্তাও ছড়িয়ে দিচ্ছে।
বাংলাদেশ সময়: ২৩:৫০:২২ ৫ বার পঠিত