![]()
জাতীয় সংসদ আজ ‘জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ পাস করেছে। এর মাধ্যমে বিদ্যমান আইন আধুনিকায়ন এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখা ব্যক্তিদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি আরও জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আজম খান বিলটি সংসদে উত্থাপন ও পাসের প্রস্তাব করেন। বিলটিতে ২০২২ সালের জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইন সংশোধন করে ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’-দের পাশাপাশি ‘মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী’দের আনুষ্ঠানিকভাবে শ্রেণিভুক্ত ও সম্মান জানানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিলটিতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সংরক্ষণ এবং সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের মূল লক্ষ্য বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
সংশোধনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী এবং দেশ-বিদেশে থেকে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা প্রদানকারীদের মধ্যে আনুষ্ঠানিক পার্থক্য নির্ধারণ।
খসড়া অনুযায়ী, ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে তাদেরই গণ্য করা হবে যারা ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন বা সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। এ শ্রেণিতে নির্যাতিত নারী (বীরাঙ্গনা) এবং ফিল্ড হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসাকর্মীরাও অন্তর্ভুক্ত থাকবেন।
বিলে বলা হয়েছে, ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ বলতে বোঝাবে—যারা ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের গ্রাম ও শহরে যুদ্ধের প্রস্তুতি ও অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন এবং যারা বাংলাদেশের সীমানা অতিক্রম করে ভারতে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে যোগদান করে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন এবং পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী ও তাদের দেশীয় সহযোগীদের বিরুদ্ধে সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন।
অন্যদিকে, ‘মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী’ বলতে বোঝানো হয়েছে—যারা ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশ বা বিদেশে অবস্থান করে মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করা, যুদ্ধকে ত্বরান্বিত করা, সংগঠকের ভূমিকা পালন, বিশ্বজনমত গঠন, কূটনৈতিক সমর্থন অর্জন এবং মনোবল বৃদ্ধি করার কাজে অবদান রেখেছেন।
বিলে কাউন্সিলের আর্থিক ব্যবস্থাপনাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে ‘জামুকা ফান্ড’ নামে একটি বিশেষ তহবিল গঠনের প্রস্তাব রয়েছে, যা সরকারি অনুদান, বেসরকারি দান এবং আন্তর্জাতিক সহায়তার মাধ্যমে পরিচালিত হবে।
এই তহবিল সরকারের পাবলিক অ্যাকাউন্ট ব্যবস্থার আওতায় একটি পার্সোনাল লেজার অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে পরিচালিত হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যয়ের জন্য সরকারের পূর্বানুমোদন সাপেক্ষে ঋণ গ্রহণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
বিলে জামুকাকে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে যে, মুক্তিযোদ্ধা-সম্পর্কিত কোনো সংগঠনের নির্বাহী কমিটি বাতিল বা ভেঙে দেওয়া হলে সেখানে প্রশাসক নিয়োগ বা ১১ সদস্যের অ্যাডহক কমিটি গঠন করতে পারবে।
বিলের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, ২০০২ ও ২০২২ সালের আইনগুলো মূলত তালিকাভুক্তি ও কল্যাণমূলক বিষয়ে কেন্দ্রীভূত ছিল। তবে ২০২৬ সালের এই সংশোধনীর মাধ্যমে জাতীয় জীবনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অটুট রাখা এবং যুদ্ধজয়ে সহায়ক ভূমিকা রাখা ব্যক্তিদের পৃথক স্বীকৃতি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এই বিলটি ২০২৫ সালের জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (সংশোধন) অধ্যাদেশের ধারাবাহিকতায় আনা হয়েছে, যা পাস হওয়ার পর নতুন আইনের মাধ্যমে প্রতিস্থাপিত হবে।
বিলের বিরোধিতা করলেও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী’র আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারীদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন।
তিনি বলেন, মানবতা ও ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা নিয়ে দেশ স্বাধীন হলেও স্বাধীনতার পর বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। জনগণের ম্যান্ডেট অস্বীকার করার কারণেই মুক্তিযুদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠেছিল, তবে স্বাধীনতার পর শাসকরা তা দ্রুত ভুলে যান।
তিনি উল্লেখ করেন, পরবর্তীতে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পরিবর্তে একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থা চালু হয় এবং ১৯৭৫ সালে মাত্র সাত মিনিটের আলোচনায় সংসদে বহুদলীয় গণতন্ত্র বিলুপ্ত করে সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা হয়।
তিনি আরও বলেন, ১৯৭৫ সালের পর প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময়েই দেশে পুনরায় বহুদলীয় গণতন্ত্র ফিরে আসে।
জামুকা আইনের প্রসঙ্গে তিনি দাবি করেন, বর্তমান সংজ্ঞাগুলো স্বাধীনতার পরবর্তী সরকার বা জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার আমলে প্রবর্তিত হয়নি; বরং এগুলো পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের সময় যুক্ত হয়েছে।
শেষে তিনি বিভাজনের পরিবর্তে দায়িত্বশীলতা ও সহমর্মিতার ভিত্তিতে জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানান।
পরে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ জানান, এনসিপির এ বিলের প্রতি কোনো আপত্তি নেই এবং বিলটি বিবেচনার জন্য সংসদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
এরপর তিনি বিলটি ভোটে দেন এবং কণ্ঠভোটে তা পাস হয়।
বাংলাদেশ সময়: ২৩:২৫:৩১ ৮ বার পঠিত