![]()
প্রবাসীদের বিভিন্ন সেবা সহজ করা এবং তাদের জন্য বিশেষ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে প্রবাসী কার্ড চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বর্তমানে জর্ডান, দক্ষিণ কোরিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে এই কার্ডের কার্যক্রম পরীক্ষামূলকভাবে চলছে বলে জানিয়েছেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক।
তিনি বলেন, প্রবাসী কার্ডে আর্থিক লেনদেনসহ দেশ-বিদেশে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সেবা পাওয়ার সুযোগ সহজ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
আজ মঙ্গলবার রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে দুই দিনব্যাপী এক সম্মেলনের প্রথম অধিবেশনে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী নুর। বেসরকারি সংস্থা রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) ৩০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজন করা এই সম্মেলন।
জোরপূর্বক ও স্বেচ্ছামূলক অভিবাসন এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বাস্তুচ্যুতি নিয়ে কাজের ৩০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ‘সোনার মানুষ সম্মিলন ২০২৬’ শীর্ষক এই সম্মেলন ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের উদ্যোগ নেয় রামরু।
অনুষ্ঠানে প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক বলেন, প্রবাসীরা আমাদের সোনার মানুষ। তাদের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার পাশাপাশি বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে। প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের চেষ্টা চলছে। এ লক্ষ্যে ১১টি খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
প্রবাসীদের সঙ্গে নিজের যোগাযোগের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০০৮ সালের ছাত্র আন্দোলন থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকার সময় বিভিন্ন দেশের প্রবাসীদের সঙ্গে গুগল মিট ও জুমের মাধ্যমে কথা বলেছেন তিনি। তাদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রবাসীদের তিনটি সাধারণ সমস্যা চিহ্নিত করেছেন।
নুরুল হক বলেন, প্রথমত, দেশে পাসপোর্ট তৈরি করতেও অনেক সময় দালালের সহায়তা নিতে হয়। পাসপোর্ট সেবায় দালালচক্র ও দুর্নীতি বন্ধ করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, অনেক প্রবাসী বিদেশে যাওয়ার পর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ পান না।
ঋণ করে বিদেশে গিয়ে প্রত্যাশিত কাজ না পেয়ে তাদের দুর্ভোগে পড়তে হয়। তৃতীয়ত, বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলো থেকে সেবা পেতে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। এ ছাড়া বিমানবন্দরের অব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন সমস্যার কথাও প্রবাসীরা জানিয়েছেন।
প্রবাসী কার্ডের কার্যক্রম সম্পর্কে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এই কার্ডের মাধ্যমে প্রবাসীদের মৌলিক তথ্য সংরক্ষণ থেকে শুরু করে বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাস এবং দেশে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সেবা পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রেও তাদের জন্য বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
অনেক প্রবাসী দেশে ফিরে জমিজমাসংক্রান্ত সমস্যায় পড়েন। এসব সমস্যা সমাধানে দ্রুত সেবা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। বলেন, সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে, বিশেষ করে সাত দিনের মধ্যে, প্রয়োজনীয় সেবা বা প্রতিকার দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাতে প্রবাসীদের উৎসাহিত করার জন্য তিন শতাংশ প্রণোদনার ব্যবস্থা রয়েছে বলেও জানান তিনি। ব্যাংকিং খাতের প্রতি মানুষের আস্থার সংকটের প্রসঙ্গ তুলে নুরুল হক বলেন, আগের সরকারের আমলে ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে নানা অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা কমেছে। এ পরিস্থিতিতে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংককে আরো কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ব্যাংকটিকে সাধারণ ব্যাংকিং কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রবাসী কার্ডের সঙ্গে এই ব্যাংকের সংযোগ রাখার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
বর্তমানে প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংক থেকে প্রবাসীদের তিন লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। এই ঋণসুবিধার পরিধি বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রবাসীরা দেশে ফিরে ব্যবসা শুরু করতে, নতুন কোনো উদ্যোগ নিতে কিংবা বাড়ি নির্মাণ করতে চাইলে তাদের ঋণ দিয়ে সহযোগিতা করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে ঋণপ্রাপ্তি আরো সহজ ও সহজলভ্য করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে অনিয়ম ও অবৈধ প্রক্রিয়া বন্ধ করতে সরকার কাজ করছে। একই সঙ্গে প্রবাসীরা যাতে বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠান, সে বিষয়েও বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তরুণদের আকাঙ্ক্ষার কথা উল্লেখ করে নুরুল হক বলেন, গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশের উন্নয়নে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। অভিবাসন খাতেও এসব প্রতিষ্ঠানের অবদান রয়েছে। গত তিন দশকে এ খাতে অর্জিত অভিজ্ঞতা আগামী দিনেও বাংলাদেশের উন্নয়ন এবং অভিবাসন ব্যবস্থার উন্নতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
তিনি বলেন, তরুণেরা যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছেন, সেই বাংলাদেশ বিনির্মাণে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। দেশের উন্নয়ন এবং মানুষের প্রত্যাশা পূরণে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
গত তিন দশকে রামরু ১০০টির বেশি গবেষণা পরিচালনা করেছে, ১৩টি জাতীয় নীতি ও কৌশল প্রণয়নে অবদান রেখেছে এবং বাংলাদেশের ২১ জেলায় অভিবাসীদের অধিকারভিত্তিক সেবা দিয়েছে। এসব কাজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা, অভিবাসনসংক্রান্ত নতুন জ্ঞান বিনিময় এবং আগামী দিনের নীতিগত অগ্রাধিকার নির্ধারণ সম্মেলনের অন্যতম উদ্দেশ্য।
সম্মেলনের উদ্বোধনী বক্তব্য দেন অনুষ্ঠান সঞ্চালক রামরুর উপনির্বাহী পরিচালক মোতাসিম বিল্লাহ এবং পরিচালক (প্রোগ্রাম) মারিনা সুলতানা। পরে রামরুর অভিবাসনবিষয়ক প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। অনুষ্ঠানে সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ, গবেষক, সাংস্কৃতিক কর্মী, আন্তর্জাতিক ও দেশীয় উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যমবিষয়ক উন্নয়ন সংগঠন সমষ্টি এবং গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশ সময়: ১৩:৩৮:২৩ ১২ বার পঠিত