আজ চাঁদপুর মুক্ত দিবস

প্রথম পাতা » চট্টগ্রাম » আজ চাঁদপুর মুক্ত দিবস
বৃহস্পতিবার, ৮ ডিসেম্বর ২০২২



আজ চাঁদপুর মুক্ত দিবস

১৯৭১ সালের ৮ ডিসেম্বর চাঁদপুর পাক হানাদার বাহিনীর কবল থেকে মুক্তি পেয়েছিল।
চাঁদপুর সদর থানার সামনে এই দিন বিএলএফ বাহিনীর প্রধান মরহুম রবিউল আউয়াল কিরণ প্রথম চাঁদপুরে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেছিলেন।
১৯৭১ সালের ৭ এপ্রিল চাঁদপুরে পাক হানাদার বাহিনী দুটি বিমান থেকে সেলিংয়ের মাধ্যমে প্রথম আক্রমণের সূচনা করে। প্রথম দিনেই হামলায় শহরের পুরান বাজার এলাকায় এক নারী পথচারী নিহত হন। পরদিন বিকেলে প্রায় ৫ শতাধিক পাকসেনার একটি বহর চাঁদপুর আসে।
শহর থেকে ৩ কিলোমিটার দূরে চাঁদপুর কারিগরি উচ্চ বিদ্যালয়টি অস্থায়ী ক্যাম্প তৈরি করে পাক সেনারা। এ স্কুলের মাঠ থেকে প্রতিদিনের মতো লতুফা বেগম নামে এক বৃদ্ধা গরু-ছাগল নিয়ে বাড়ি যাওয়ার সময় পাক বাহিনীর সদস্যরা রাতের খাবার জোগাড় করার জন্যে প্রথম অপারেশন হিসেবে ওই বৃদ্ধাকে গুলি করে হত্যা করে এবং বৃদ্ধার একটি গরু ও একটি ছাগল নিয়ে যায়। আর পাক সেনা অফিসারদের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের রেস্ট হাউজটি নির্ধারণ করা হয়েছিল।
নিহত লতুফা বেগমের নাতি মো. সিরাজ মৃধা বলেন, তার দাদিকে প্রকাশ্যে হত্যা করে হানাদার বাহিনী গরু-ছাগল নিয়ে যায়। সে দূর থেকে দেখলেও কিছুই করতে পারেনি। ওই ক্ষোভ এখনো তার মনে রয়েছে।
কারিগরি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠের বর্বরতম নির্যাতনের প্রত্যক্ষদর্শী তরপুরু চন্ডী গ্রামের মিজি বাড়ীর বাসিন্দা জসিম মিজি বলেন, তিনি এবং তার বড় ভাইকে সন্ধ্যার দিকে এনে কবর খননের নির্দেশ দেয়। তখন তারা বাড়িতে যাবে বলে জানালে তাদেরকে বেধম পিটিয়ে আহত করে। পরে জোর করে তাদের দিয়ে তিনটি কবর খনন করা হয়। ওই কবরই পরে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে নিহত তিনজন পাক সেনা সদস্যকে কবর দেওয়া হয়।
৮ এপ্রিল রাতেই চাঁদপুরে অবস্থানরত ২ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা বিচ্ছিন্নভাবে হানাদার বাহিনীর ক্যাম্পে হামলা চালান। হামলা দেখে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীরা এলোপাথাড়ি গুলি ছুঁড়তে শুরু করে। তখন কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা মারাত্মক আহত হন। ৯ এপ্রিল ভোরে পাকিস্তানি মিলিটারি শহরে ঢুকে চাঁদপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ইসমাইল হোসেন ভলন্টিয়ার (৫৫) নামে এক ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করে। একই সঙ্গে তারা শহরের হাসান আলী হাই স্কুলের মোড়ে আপাক ও মাখন নামে দুই যুবককে সাইকেলে চালাতে দেখে গুলি করে হত্যা করে।
এরপরেই তারা শুরু করে তাদের মূল অপারেশন কার্যক্রম। এজন্য চাঁদপুর বড় স্টেশন মোলহেড এলাকায় হানাদার বাহিনীর একটি টর্চার সেল গঠন করে। এখানে চাঁদপুর রেলপথ, সড়কপথ এবং নৌ-পথে যে সব যাত্রীদের সন্দেহ হয়েছে, সেসব নারী-পুরুষকে এনে অমানবিক নির্যাতন, হত্যা, ধর্ষণ করেছে। পরে ওই মরদেহগুলো মেঘনা এবং পদ্মা নদীতে ফেলে দিয়ে। যার সাক্ষী আজও পদ্মা-মেঘনা নদী বহন করছে।
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি রক্ষার্থে চাঁদপুর পৌরসভা ও জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ২০১৩ সালে বড় স্টেশনে ‘রক্তধারা’ নামে বধ্যভূমি নির্মাণ করা হয়। এর আগে চাঁদপুরের প্রথম শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সুশীল, সংকর ও খালেকের নামে ট্রাক রোডে নির্মাণ করা হয় ‘মুক্তিসৌধ’ এবং চাঁদপুর শহরের প্রাণকেন্দ্রে লেকের ওপর দৃশ্যত: ভাসমান মুক্তিস্মৃতি সৌধ ‘অঙ্গীকার’ নির্মাণ করা হয়।
চাঁদপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সম্মুখে এ জেলায় স্বাধীনতা যুদ্ধে যারা শহীদ হয়েছেন তাদের নামের তালিকা সম্বলিত একটি স্মৃতি ফলক নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়াও চাঁদপুর পৌরসভার ৫ রাস্তার মোড়ে পৌরসভার অর্থায়নে নির্মাণ করা হয় ‘শপথ চত্বর’।
এপ্রিল থেকে হানাদার বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের চলে দফায় দফায় গোলাগুলি। পরে গঠন করা হয় শান্তিবাহিনী। তারপর নতুন কায়দায় শান্তি বাহিনী ও পাক বাহিনী বিভিন্ন জায়গায় চালাতে থাকে বর্বর অত্যাচার ও হত্যাযজ্ঞ। ৩৬ ঘণ্টা যুদ্ধের পর পালিয়ে যায় তারা।
এভাবে ৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাকিস্তানের দোসররা কত লোককে হত্যা করেছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। চাঁদপুর জেলায় (তৎকালীন মহকুমা) সর্বশেষ যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিল ৭ ডিসেম্বর লাকসাম ও মুদাফ্ফরগঞ্জ মুক্ত হওয়ার পর। যৌথ বাহিনী হাজীগঞ্জ দিয়ে ৬ ডিসেম্বর চাঁদপুর আসতে থাকলে মুক্তিসেনারা হানাদার বাহিনী প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়।
ভারতীয় গার্ডস রেজিমেন্টের নেতৃত্বে ৩১১তম মাউন্টেন ব্রিগেড ও ইস্টার্ন সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধাদের যৌথ আক্রমণ চালায়। দিশে না পেয়ে পাকিস্তান ৩৯ অস্থায়ী ডিভিশনের কমান্ডিং অফিসার মেজর জেনারেল রহিম খানের নেতৃত্বে দু’টি জাহাজে করে নৌ-পথে ঢাকার উদ্দেশ্যে চাঁদপুর থেকে পালিয়ে যাওয়ার সময় মুক্তি বাহিনী ও মিত্র বাহিনীর ট্যাংক ও বিমান আক্রমণে চির কবর রচনা হয় নদীতে।
১৯৯২ সাল থেকে প্রতি বছর ১ ডিসেম্বর সার্বজনীনভাবে চাঁদপুর শহরের হাসান আলী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে অঙ্গীকারের পাদদেশে মাসব্যাপী মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। তবে ২০২১ সাল থেকে এই মেলা শহরের আউটার স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
আজকে চাঁদপুর মুক্ত দিবস উপলক্ষে জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নেতৃত্ব একটি র্যারি শহরের কালী বাড়ী থেকে বিকেল ৩ টায় বের হয়ে মেলার মাঠে গিয়ে শেষ হবে। পরে সেখানে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা গন সহ মুক্তিযোদ্ধাগণ অংশ নিবেন।

বাংলাদেশ সময়: ১৪:৩৪:১১   ৩৪৬ বার পঠিত  




পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

চট্টগ্রাম’র আরও খবর


জুলাই জাতীয় সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করব : সালাহউদ্দিন
নির্বাচনে দায়িত্বে থাকবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ৯ লাখ সদস্য : স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা
আমরা এমন একটি সংসদ চাই, যেখানে মানুষের কথা বলা হবে: সালাহউদ্দিন
ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের শিক্ষা দিয়ে গেছেন খালেদা জিয়া : জোনায়েদ সাকি
টেকনাফে ১ লাখ পিস ইয়াবাসহ মাদক ব্যবসায়ী আটক
শিক্ষককে প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর ও হুমকি নিয়ে অবস্থান ব্যাখা করল চাকসু
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত করার আহ্বান হাসনাত আবদুল্লাহর
বিলুপ্ত প্রাণী সংরক্ষণ অত্যন্ত জরুরি - মৎস্য উপদেষ্টা
মিয়ানমার থেকে ছোড়া গুলিতে বাংলাদেশি কিশোরী আহত
মুক্তিযোদ্ধাদের অসম্মানী করা মানে দেশের স্বাধীনতা অর্জনকেই অস্বীকার করা : কামরুল হুদা

News 2 Narayanganj News Archive

আর্কাইভ